বাংলাদেশি কর্মজীবীদের একসময়ের জনপ্রিয় গন্তব্য ছিল লিবিয়া। উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া আফ্রিকার বৃহত্তম রাষ্ট্রগুলোর একটি। পেট্রোলিয়ামের বিরাট মজুত আবিষ্কারের পর থেকে লিবিয়া আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী দেশগুলোরও একটি। সেই লিবিয়া এখনো বাংলাদেশি শ্রমজীবীদের কাছে জোর আলোচনায়। লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের কাজের জায়গাটি আর আগের মতো নেই। কিন্তু শ্রমবাজারের আলোচনায়, অবৈধ আদম বেপারীদের প্রতারণায় লিবিয়ার নাম এখন সবার আগে। লিবিয়া এখন বাংলাদেশি জনশক্তি পাচারের বড় রুট হিসেবে পরিচিত। লিবিয়া হয়ে ইতালি কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতে দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে মানুষ। পাচারকারীরা লিবিয়ায় নিয়ে সেখানে জিম্মি করে, নির্যাতন করে দেশে তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। এই এক ঘৃণ্য নারকীয় তৎপরতা। বাংলাদেশি স্বপ্নচারী কিছু মানুষকে বিদেশে পাঠানোর নাম করে লিবিয়ায় জিম্মি করে, অমানবিক নির্যাতন করে দেশে মুক্তিপণ আদায় করছে বাংলাদেশেরই কিছু মানুষ। সরকার তাদের কিছুই করছে না। কেউ কেউ ধরা পড়লে স্থানীয়ভাবে সালিশ করে পার পেয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কেউ কেউ এ জঘন্য মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। গাদ্দাফির ক্ষমতাচ্যুতির পর গত দেড় দশকে লিবিয়া হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধীদের অভয়ারণ্য।
দীর্ঘ ৪২ বছরের স্বৈরশাসক কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৪ বছর পরও লিবিয়ায় তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। আফ্রিকার জনপ্রিয় নেতা গাদ্দাফি ছিলেন নানা কারণেই পশ্চিমা বিশ্বের চক্ষুশূল। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের জের ধরে জাতিসংঘের সহায়তায় পশ্চিমারা গাদ্দাফিকে হত্যা ও ক্ষমতাচ্যুত করে। ২০১১ সালে মৃত্যুর ১৪ বছর পরও লিবিয়ার তরুণ প্রজন্ম গাদ্দাফির ক্ষমতা দখলের দিনটিকে (১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর) প্রতি বছর গাদ্দাফিভক্তরা উদ্যাপন করে থাকেন।
প্রায় ৯৭ শতাংশ মুসলমানের দেশ লিবিয়ায় গাদ্দাফি প্রতিষ্ঠা করেন এক অদ্ভুত স্বৈরতন্ত্র। তাঁর ইচ্ছার বাইরে গিয়ে নাগরিকদের কিছুই করার ছিল না। আকারে বিশাল (১,৭৫৯,৫৪০ বর্গকিলোমিটার, আয়তনে বিশ্বের ১৬তম বৃহত্তম দেশ) হলেও লিবিয়াতে জনবসতি খুবই কম। দেশের বেশির ভাগ অংশজুড়ে রয়েছে সাহারা মরুভূমি। ১৯৫০-এর দশকে খনিজ তেল আবিষ্কারের আগে লিবিয়া ছিল একটি দরিদ্র রাষ্ট্র। পেট্রোলিয়ামের বিরাট মজুত আবিষ্কারের পর থেকে লিবিয়া আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি।
ইতালীয়রা ২০ শতকের প্রথম ভাগে লিবিয়াকে একটি উপনিবেশে পরিণত করে। ১৯৫১ সালে দেশটি একটি স্বাধীন রাজতন্ত্রে পরিণত হয় এবং ১৯৬৯ সালে তরুণ সামরিক অফিসার মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি ক্ষমতা দখল করেন। তিনি লিবিয়াকে একটি সমাজতান্ত্রিক আরব গণপ্রজাতন্ত্র আখ্যা দেন। তবে গাদ্দাফির শাসনকালে লিবিয়ার বাইরের লোকদের কাছে দেশটি একটি সামরিক একনায়কতন্ত্র হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল। ১৯৫১ সালে রাজা ইদ্রিসের শাসনামলে জাতিসংঘ দেশটিকে স্বাধীনতা প্রদান করে। ১৯৬৯ সালে, মুয়াম্মার গাদ্দাফির নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে রাজা প্রথম ইদ্রিস উৎখাত হন। গাদ্দাফি তখন পশ্চিমাবিরোধী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ সালে গাদ্দাফি সব ব্রিটিশ এবং আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
১৯৬৯ সালের পর লিবিয়ার জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৬৮ সালে তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২০ লাখ। বর্তমানে প্রায় ৭৩ লাখ (২০২৩)। ১৯৬৯ সাল থেকে অনেক অভিবাসী শ্রমিক লিবিয়ায় আসেন। শ্রমিকদের মধ্যে ছিলেন তিউনিসিয়ার নির্মাণশ্রমিক, মিসরের শিক্ষক ও শ্রমিক, ফিলিস্তিনের শিক্ষক এবং যুগোস্লাভিয়া ও বুলগেরিয়ার ডাক্তার ও নার্স। লিবিয়ার প্যান-আফ্রিকান নীতিতে পরিবর্তন আনার পর ১৯৯০-এর দশকে ১০ লাখ শ্রমিক মূলত সুদান, নাইজার, চাদ এবং মালির মতো অন্যান্য প্রতিবেশী আফ্রিকান দেশ থেকে লিবিয়ায় আসেন। গাদ্দাফি তেল বিক্রির অর্থ জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি গেরিলাদের লড়াইয়ে সহায়তা করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে, লিবিয়া উগান্ডার গৃহযুদ্ধে ইদি আমিনের সরকারকে সহায়তা করার জন্য উগান্ডায় যুদ্ধ করে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে, ইতালি এবং লিবিয়া একটি স্মারকলিপি স্বাক্ষর করে যার মাধ্যমে ইতালি পরবর্তী ২০ বছরে ৩০ বছরের উপনিবেশকালের রাজত্বের জন্য লিবিয়াকে ৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেবে বলে চুক্তি হয়।
লিবিয়ার স্বৈরশাসক এবং একসময়ের জনপ্রিয় নেতা গাদ্দাফিকে ভুলতে পারে না আফ্রিকার মানুষ। তারা মনে করেন, গাদ্দাফি ছিলেন আফ্রিকার হতদরিদ্র মানুষদের অন্যতম আশ্রয়স্থল। আরব বসন্তের নামে গাদ্দাফিকে হত্যার পর ফ্রান্সসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো আবার আফ্রিকার দেশে দেশে তাদের পুরোনো কলোনিগুলোতে প্রভাববলয় বাড়াতে শুরু করে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে তাদের তৎপরতা লক্ষণীয় হারে বেড়েছে। কর্নেল গাদ্দাফির মায়ের বাড়ি ছিল মালিতে। মালির কিদাল শহরে ছিল গাদ্দাফির মামার বাড়ি। এজন্য তিনি মালির প্রতি আলাদা টান অনুভব করতেন। তিনি মালির উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। মালির রাজধানী বামাকা শহরে গাদ্দাফির অনেক স্মৃতি রয়েছে। নাইজার নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে বামাকা নগরী। বামাকার দুই অংশ দুটি সেতু দ্বারা সংযুক্ত। সেতুসংলগ্ন পাঁচতারকা হোটেলটির নামই লিবিয়া হোটেল। লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফির পতন ও মৃত্যুর পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। গাদ্দাফি বেঁচে থাকতে লিবিয়ার সঙ্গে মালির খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। অনেক ব্রিজ, রাস্তাঘাট গাদ্দাফি করে দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের মে মাসে মালির জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন পরিদর্শনে গিয়ে গাদ্দাফির অনেক কীর্তি চোখে পড়ে। মালির শত বছরের শান্ত জনপদের পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দেয় আরব বসন্তের ঢেউ। ২০১১ সালে গাদ্দাফির পতনের পর তাঁর বিপুলসংখ্যক ভাড়াটে সৈনিক অস্ত্রের সম্ভার চুরি করে ফিরে আসেন উত্তর মালির পূর্বপুরুষের ভিটায়। এ কপর্দকশূন্য, অবহেলিত বেকার কিন্তু প্রশিক্ষিত সশস্ত্র লোকজনের ওপরই চোখ পড়ে উত্তর আফ্রিকার ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদা ইন দি ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম)-এর। সংগঠনটি মালির সীমান্তবর্তী দেশ আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া, নাইজার আর বুরকিনা ফাসো থেকে তাদের কর্মতৎপরতাকে প্রসারিত করে এ অঞ্চলে। অত্যন্ত দুর্বল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, পশ্চাৎপদতা ও অনিশ্চয়তায় জর্জরিত জনপদটি জেহাদিদের সর্বগ্রাসী থাবা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। শুরু হয় পরস্পরবিরোধী গ্রুপগুলোর মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত ও নৈরাজ্য। স্বৈরশাসক গাদ্দাফি সরকারের পতনের পর লিবিয়ায় একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের দূতাবাস গুছিয়ে নিয়েছে। দেশের দক্ষিণ অঞ্চল পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে। উত্তরাঞ্চল হয়েছে মানব পাচারের সিল্করুট। গাদ্দাফি একটি শক্তিশালী আফ্রিকার স্বপ্ন দেখতেন। সেজন্যই হয়তো ২০১১ সালে লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ বিলিয়ন ডলার অর্থ জব্দ করেছিলেন বারাক ওবামা।
ক্ষমতা মানুষকে দুর্বিনীত, দুর্নীতিগ্রস্ত, শেষ পর্যন্ত অন্ধ করে দেয়। গাদ্দাফি তারই একটা বড় উদাহরণ হতে পারেন। বেদুইন পরিবারের সন্তান গাদ্দাফি ৪২ বছর কঠোর হাতে লিবিয়া শাসন করেছেন। তিনি নিজেকে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গেও তুলনা করতেন। সব একনায়কতন্ত্রই চায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব বিস্তার করতে। গাদ্দাফির প্রশাসনের এ ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ এবং নৈপুণ্য ছিল। তাঁর শাসনোমলে স্বৈরতন্ত্র ঢুকে পড়েছিল একেবারে ঘরের ভিতর। সিনেমা বন্ধ, থিয়েটার বন্ধ, গানবাজনা বন্ধ, ফুটবল খেলাও বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। কোনো কিছুকে উপলক্ষ্য করে সাধারণ মানুষ একসঙ্গে হওয়া ছিল এক বিরাট সমস্যা। তারা যখন বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করল, তখন ট্রাক ভর্তি করে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেওয়া হলো। গাদ্দাফি ঘোষণা করলেন, বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে লিবিয়ার বিশুদ্ধ সংস্কৃতির ওপর বিদেশি প্রভাব বিস্তারের একটা উপায়। বাদ্যযন্ত্র সব শহরের এক খোলা জায়গায় জড়ো করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। একবার একইভাবে ট্রাক পাঠানো হলো সব বইয়ের দোকান থেকে বই তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। গাদ্দাফিবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ টেলিভিশনে প্রচার করা হতো। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাও দেখানো হতো টিভিতে। সরকারের ভিন্নমতাবলম্বীদের বিদেশে পালিয়েও রক্ষা ছিল না। বিদেশ থেকেও ধরে এনে তার শাস্তি কার্যকর করা হতো। এমনকি বিদেশেও গুপ্তহত্যার শিকার হতেন বিরুদ্ধ মতের মানুষরা। গাদ্দাফি এটা স্পষ্ট করেছিলেন যে, দেশের বাইরে বসেও যদি কেউ তাঁর বিরোধিতা করে তাহলে তিনি তাকে খুঁজে বের করবেন। দেশে হোক কিংবা বিদেশে গাদ্দাফির বিরোধিতা করা মানে তাঁর জীবনের পরিসর সংক্ষিপ্ত করে ফেলা।
গাদ্দাফির চারপাশে সশস্ত্র নারী সৈন্যদের পাহারা দেখা যেত সব সময়। গাদ্দাফি তাঁর নিরাপত্তার জন্য লিবিয়ার লোক না নিয়ে আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে ভাড়া করে মহিলা সৈনিক নিয়ে এসেছিলেন। এ ‘আমাজন’ বাহিনী তাঁর ত্রিপোলির প্রাসাদ রক্ষা করত। বেদুইনদের মতো একাধিক বিয়ে করেছিলেন। ৪২ বছরের শাসনামলে গাদ্দাফি তেল সম্পদকে ব্যবহার করে লিবিয়াকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন; কিন্তু দুঃশাসনের কারণে মানুষের অসন্তোষ, অসমতা দূর করতে পারেননি তিনি। একসময় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক বিপর্যয় নামে একসঙ্গে। ফিলিস্তিন ছাড়া রাজতন্ত্র প্রভাবিত এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কয়েক দশক যাবৎ মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলীর পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বলে ওঠে গণ আন্দোলনের বহ্নিশিখা। তিউনিসিয়া, মিসর, জর্ডান, লেবানন, মরক্কো, আলজেরিয়া ও সিরিয়া হয়ে এ গণবিক্ষোভের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে আফ্রিকার ৯৭ ভাগ মুসলমানের দেশ লিবিয়ায়। প্রতিটি রাষ্ট্রের বিক্ষোভকারীদের একটাই দাবি- সরকার পতন। জনরোষে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলী ক্ষমতা ছেড়ে পালানোর কারণে অন্যান্য দেশের বিক্ষোভকরীরাও বিপুল উৎসাহে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নেমে পড়েন। মিসরে গণ আন্দোলনে দীর্ঘ ৩০ বছর ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারকের পতনের পরপরই ৪২ বছরের স্বৈরশাসক লিবিয়ার কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে শুরু হয় আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা জোটের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে পতন হয় গাদ্দাফির।
লিবিয়ার বিশৃঙ্খল রাজনীতি, দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতি এবং চরম অরাজক অবস্থার মধ্যে ‘শান্তির অবতার’ হিসাবে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনীর কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি অল্প সময়ে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং দেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেন। এত উন্নয়নের পরও কেন গাদ্দাফির শোচনীয় পতন হলো তার নেপথ্য কারণ জানতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করেছেন।
আর্থসামাজিক উন্নয়ন কখনো গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার পরিপূরক হতে পারে না। গাদ্দাফির শাসনামলে লিবিয়া ছিল রূপকথার দেশ। রাস্তার দুই পাশের সাধারণ বাড়িঘরের জৌলুশ ছিল প্রাসাদের মতো। ধূসর সাহারার মরু প্রান্তরের বেদুইনদের বাড়িঘরও ছিল আরব্য রজনীর কোনো স্বপ্নপুরীর মতো। অভাব-অভিযোগ, চুরি-ডাকাতি, সামাজিক অপরাধ ইত্যাদি উধাও হয়ে গিয়েছিল। সিনেমার মতো পরিপাটি এবং সাজানো গোছানো ছিল নাগরিক জীবন। তবে গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গোত্র অস্ত্র হাতে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পুরো দেশের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কেন্দ্রীয় শাসন বলতে কিছু নেই। যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে একজন নাগরিকের মুখেও শোনা যাবে না যে আমরা গাদ্দাফির আমলে ভালো ছিলাম। বরং সবার মুখে প্রায় সমস্বরে এ অভিযোগ উঠবে, গাদ্দাফির কারণেই তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তার একগুঁয়েমির কারণে পশ্চিমা দুনিয়াসহ আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, অতিমাত্রার গণতন্ত্রহীনতার কারণে সামাজিক সংহতি বিনষ্ট এবং একদলীয় স্বৈরাচারী শাসনের কারণে সামাজিক অসন্তোষ, পারস্পরিক ঘৃণা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। পতনের সব ক্ষেত্র যেন প্রস্তুত করাই ছিল। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। কর্নেল গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে নানা আলোচনা প্রচলিত আছে। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির পতনের পর পশ্চিমা বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে কর্নেল গাদ্দাফিসহ কয়েকজন দুটি বড় কংক্রিটের পাইপের ভিতরে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি ছিলেন আহত ও বিপর্যস্ত। দুপুর ১২টার দিকে কর্নেল গাদ্দাফিকে জীবিত কিন্তু গুরুতর আহত অবস্থায় আটক করা হয়। আলজাজিরা টিভিতে দেখা যায়, বিভ্রান্ত গাদ্দাফিকে বিদ্রোহী যোদ্ধারা টানাহেঁচড়া করছে। পরে প্রচার করা হয়, বিপ্লবী বাহিনী আর গাদ্দাফি বাহিনীর গোলাগুলির ক্রসফায়ারে তাঁর মাথায় গুলি লাগে এবং তিনি মারা যান।
লেখক : সাংবাদিক
ইমেইল: [email protected]