উদ্যোক্তা মানে শুধু ব্যবসা করাই নয়, এটি এক স্বপ্ন বাস্তবায়নের গল্প। বিশেষত নারীদের জন্য, যাদের সামাজিক ও পেশাগত জীবনে অসংখ্য বাধা অতিক্রম করতে হয়। তবুও কিছু নারী আছেন যারা সাহস, নিষ্ঠা ও উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। তারা লাখ লাখ মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। জেনে নেওয়া যাক ২০২৫ সালের ১০ জন অনুপ্রেরণীয় নারী উদ্যোক্তার গল্প।
১. সারা ব্লেকলি [ স্প্যাংক্সের প্রতিষ্ঠাতা ]
মাত্র ৫ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে বনে যান বিলিয়নার
নাম তার সারা ব্লেকলি। আমেরিকান অন্তর্বাস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্প্যাংক্সের প্রতিষ্ঠাতা। এক সময় বিশ্বব্যাপী হইচই ফেলে দিয়েছিল স্প্যাংক্স এবং এখনো ধরে রেখেছে নিজ সুনাম। সফল উদ্যোক্তার তালিকায় উপরের দিকেই থাকে তার নাম। অথচ তার শুরুটাও খুব আহামরি কিছু ছিল না। কর্মজীবনের শুরুতে ফ্লোরিডার ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ডে কাজ করেন তিনি। এক সময় দরজায় দরজায় বিক্রি করতেন ফ্যাক্স মেশিন। পরবর্তীতে তার উদ্ভাবনী চিন্তায় এই নারী তৈরি করেন ‘স্প্যাংক্স’-বিশ্বখ্যাত অন্তর্বাস ব্র্যান্ড।
মাত্র পাঁচ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে শুরু করা এই কোম্পানির মূল্য এখন বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি তিনি ‘সারা ব্লেকলি ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা-দের তহবিল ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করেন।
২. ওপ্রাহ উইনফ্রে [ মিডিয়া সম্রাজ্ঞী এবং ওডিব্লউএন ]
একজন টেলিভিশন উপস্থাপক থেকে মিডিয়া সাম্রাজ্যের মালিক
ওপ্রাহ উইনফ্রে, একজন উদ্যোক্তা, মিডিয়া। তিনি বিংশ শতাব্দীর ধনী আফ্রো-আমেরিকান এবং উত্তর আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ বিলিয়নিয়ার। শুধু কী তাই! আমেরিকার ইতিহাসে ওপ্রাহ উইনফ্রে সর্বশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ জনহিতৈষীর তকমাও অর্জন করেছেন। শৈশবে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। স্থানীয় গ্রোসারি স্টোর থেকে তার কাজের সূচনা, সেই ওপ্রাহ আজকের বিশ্বে এক বিশাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। এক সময় তিনি সর্বকনিষ্ঠ একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ উপস্থাপিকা হিসেবে খ্যতি অর্জন করেন। পরে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানের টেলিভিশনে উপস্থাপিকা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। নিজের চ্যানেল ‘ওপ্রাহ উইনফ্রে নেটওয়ার্ক’ (OWN) চালু করেছিলেন। যা নানাবিধ সমাজকল্যাণমূলক কাজেও জড়িত।
৩. শেরিল স্যান্ডবার্গ [ ফেসবুকের সাবেক সিইও ]
কড়া মনের মানুষ শেরিল, সফলতা এবং বিতর্ক যার সঙ্গী
প্রযুক্তিবিশ্বে এক দশকের বেশি সময় ধরে পরিচিত নাম শেরিল স্যান্ডবার্গ। ফেসবুকের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাকে চেনেন অনেকে। ফেসবুকের মতো বিশাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সামলানো এবং নানা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শেরিলের পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর সময় ফেসবুকের ব্যাপ্তি যেমন খুব দ্রুত বেড়েছে, তেমনি তাকে নানা বিতর্কের মুখোমুখিও হতে হয়েছে। কর্পোরেট জগতে শেরিল নারীদের নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে আসার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এমনকী ‘লিন ইন’ নামক এক অলাভজনক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন তিনি। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। তিনি ‘লিন ইন’ নামে বইও লিখেছেন। যা কর্মজীবীদের (নারীর) জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
৪. মেলিন্ডা ফ্রেঞ্জ গেটস [ জনহিতৈষী ও উদ্যোক্তা ]
মেলিন্ডা স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন
মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী মানবপ্রেমী ও নারী ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব। জন্মকালীন সময়ে তার নাম ছিল মেলিন্ডা অ্যান ফ্রেঞ্চ। তার অন্যতম পরিচয় হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী ব্যক্তি ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সাবেক সহধর্মিণী। তিনি কেবল বিল গেটসের প্রাক্তন স্ত্রী হিসেবে নন, তিনি নিজেও ছিলেন একজন সমাজসেবী এবং একজন সফল উদ্যোক্তা। মহীয়ষী এই নারী উদ্যোক্তা ‘Bill & Melinda Gates Foundation’-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নারীদের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে মেলিন্ডা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া, তিনি ‘Pivotal Ventures’ প্ল্যাটফরম চালু করেন। যা প্রযুক্তি ও নারী নেতৃত্বে সংযোগ ঘটাতে কাজ করে।
৫. টরি বার্চ [ ফ্যাশন ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা ]
ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে হয়ে ওঠেন বিলিয়নিয়ার
টরি বার্চ, একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং উদ্যোক্তা। তিনি বিখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘Tory Burch’-এর প্রতিষ্ঠাতা। টরি বার্চের ডিজাইন করা পোশাক এবং অন্যান্য অনুষঙ্গগুলোর মধ্যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক চমৎকার সংমিশ্রণ দেখা যায়। একজন সামান্য ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে এই নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যের অধিপতি। পরবর্তীকালে তিনি ফ্যাশন ডিজাইনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং টরি বার্চ ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থাও গড়ে তোলেন। যা শুধুই নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছে। তার প্রচেষ্টার ফলে অনেক নারী তাদের স্বপ্নের ব্যবসা শুরু করতে পেরেছেন। ভোগ্য ম্যাগাজিনে এক সাক্ষাৎকারে টরি বলেন, আমি একটি খামারে বেড়ে উঠেছি। আমার প্রাপ্তবয়স কেটেছে শহরে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।
৬. উইটনি ওল্ফ হার্ড [ ‘বাম্বল’-এর প্রতিষ্ঠাতা ]
ওল্ফ হার্ড ঐতিহ্যবাহী ডেটিংয়ের ধারণাকে বদলে দেন
উইটনি ওল্ফ হার্ড ডেটিং অ্যাপ টিন্ডার সহ-প্রতিষ্ঠা। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত ধারণার বাইরেও বিস্তৃত ছিল। ফলাফল হিসেবে-২০১৪ সালে তিনি বাম্বল চালু করেন। এটি এমন এক প্ল্যাটফরম যা ঐতিহ্যবাহী ডেটিংয়ের ধারণাকে বদলে দেয়। অনলাইনে নারীরা যে হতাশার সম্মুখীন হন, তা উপলব্ধি করে তিনি ডেটিংয়ে নারীদের প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেন। যা অনলাইন ডেটিংকে নিরাপদ এবং সম্মানজনক পরিবেশে রূপান্তরিত করে। ডেটিংয়ের বাইরে তিনি বাম্বলের পরিধি প্রসারিত করেন। নিছক বন্ধুত্ব এবং পেশাদার নেটওয়ার্কিংয়ের বাইরেও নানা সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি একে বৃহত্তর সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফরমে রূপান্তরিত করেন। ২০২১ সালে বাম্বল জনসম্মুখে এলে ওল্ফ হার্ড সর্বকনিষ্ঠ স্ব-নির্মিত নারী বিলিয়নিয়ার হন।
৭. জেসিকা আলবা [ ‘দ্য অনেস্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ]
অভিনয়ের পাশাপাশি আলবা উদ্যোক্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন
জেসিকা আলবার কর্মজীবন সফল অভিনয় এবং উদ্যোক্তা প্রচেষ্টার আকর্ষণীয় মিশ্রণ। তিনি ‘ডার্ক অ্যাঞ্জেল’ সিরিজে প্রধান চরিত্রে দর্শকদের মুগ্ধ করেন, যার জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোব মনোনয়ন পান। পাশাপাশি ‘সিন সিটি’ এবং ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’-এর মতো চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। অভিনয়ের পাশাপাশি আলবা ২০১১ সালে ‘দ্য অনেস্ট’ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে একটি তীক্ষè ব্যবসায়িক বুদ্ধি প্রদর্শন করেন। এই উদ্যোগটি নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব শিশু ও গৃহস্থালী পণ্য সরবরাহের ওপর নজর দেন। দ্য অনেস্ট কোম্পানি আলবাকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। নৈতিক এবং টেকসই পণ্য তৈরির প্রতি তার নিষ্ঠা ভোক্তাদের মনে সাড়া ফেলে। যা কোম্পানির জন্য অবদান রাখে।
৮. ক্যাথরিন মিনশু [ ‘দ্য মিউজ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ]
ক্যাথরিন চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন
ক্যাথরিন মিনশু একজন উদ্যোক্তা, লেখক এবং বিনিয়োগকারী। যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভবিষ্যতের একটি মানবিক কর্মক্ষেত্র তৈরিতে নজর দিয়ে আসছেন। ২০১১ সালে ক্যাথরিন ‘দ্য মিউজ’, (যা ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফরম হিসেবে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থ খরচ করে চাকরিপ্রার্থীদের পরামর্শ প্রদানের ধারণাটি তিনি প্রথম শুরু করেন। মূল্যভিত্তিক চাকরিপ্রত্যাশীদের চাকরি অনুসন্ধানীদের ক্যারিয়ার পরামর্শ, ইন্টারভিউ টিপস এবং চাকরির সুযোগ দেয় ‘দ্য মিইজ’। ক্যাথরিন প্রতিভা ও সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র সম্পর্কিত বিষয়ে একজন নিয়মিত বক্তা এবং লেখক। তার প্রথম বই, ‘দ্য নিউ রুলস অফ ওয়ার্ক’ (ক্রাউন বিজনেস, ২০১৭ সালে), ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বেস্টসেলার।
৯. অ্যাডেনা ফ্রিডম্যান [ নাসডাক-এর প্রধান নির্বাহী ]
ডিজিটাল অর্থনীতি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন ফ্রিডম্যান
অ্যাডেনা ফ্রিডম্যান বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্টক মার্কেট নাসডাকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১৭ সালে তিনি নাসডাকের প্রেসিডেন্ট এবং সিইওর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে অবশ্য তিনি ছিলেন উক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। ২০ বছরেরও বেশি শিল্পবাণিজ্যে নেতৃত্ব এবং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ছয়টি মহাদেশে অর্থনৈতিক কার্য- সহ একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্বব্যাপী এক্সচেঞ্জ এবং প্রযুক্তি সমাধান সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই নারীর। এমনকি তার নেতৃত্বে নাসডাক আরও ডিজিটালাইজড হয়েছে। তিনি অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নতুন স্টার্ট-আপদের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেন। তিনি নারী নেতৃত্বে সোচ্চার এবং আর্থিক পরিষেবা শিল্পে নারীদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিশেষত নারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করেন।
১০. ম্যাকেঞ্জি স্কট [ জনহিতৈষী ও বিনিয়োগকারী ]
দানবীর নারী হিসেবে দুনিয়াজোড়া তার সুনাম
ম্যাকেঞ্জি স্কট ছিলেন একজন জনহিতৈষী, লেখিকা এবং অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের প্রাক্তন স্ত্রী। যার সঙ্গে তিনি ২৫ বছর বিবাহিত ছিলেন। ২০১৯ সালে তাদের বিয়ে বিচ্ছেদের অংশ হিসেবে তিনি অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ‘অ্যামাজন’-এর প্রায় চার শতাংশ মালিকানা (অংশীদারিত্ব) অর্জন করেন। বিচ্ছেদের পর ম্যাকেঞ্জি তার প্রাপ্ত সম্পদের বিশাল অংশ জনহিতকর কাজে ব্যয় করেন। বিশেষত- শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য কাজ করছেন। তার অনুদান বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন প্রকল্পকে সহায়তা করছে। যার সেরা উদাহরণ হলো- ‘Yield Giving’ নামক একটি ওয়েবসাইটে, ম্যাকেঞ্জি স্কট ২,৩০০টিরও বেশি অলাভজনক সংস্থাকে দেওয়া প্রায় ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার (তার অ্যামাজন শেয়ারের ৫৩ শতাংশ) এর বিবরণ শেয়ার করেন।