সাত তলা বিশিষ্ট মিনার। এর উচ্চতা ৮০ ফুট। আকাশচুম্বী মিনার দূর থেকে জানান দেয় মসজিদের অবস্থানের কথা। সামনেই আছে দৃষ্টিনন্দন পুকুর। পুকুরে আছে শানবাঁধানো ঘাট। মসজিদের পাশেই আছে বিশাল আয়তনের কবরস্থান। কবরস্থানে আছেন বরেণ্য আলেম ও বুজুর্গদের সমাধি। ১৪২টি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে দোতলা মসজিদটি। মসজিদের পশ্চিমে আছে ২৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থের একটি ইদগাহ। প্রতি শুক্রবার দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মুসল্লি জুমার নামাজ আদায় করতে এই মসজিদে আসেন।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর খরণদ্বীপ ইউনিয়নের ৩০০ বছরের পুরোনো মোগল আমলের ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়ো মসজিদ’ এটি। স্থানীয়ভাবে জাতি-ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে বুড়ো মসজিদটি পুণ্যময় তীর্থস্থান হিসেবে সমাদৃত।
বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, স্থানীয়ভাবে এটি একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। মসজিদের মোতায়াল্লি মো. নুরুন্নবী চৌধুরী বলেন, বুড়ো মসজিদে কেবল মুসলমান নয়, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও নিজের নিয়ত পূরণে এখানে আসেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা হয়। মোঘল আমলের শেষের দিকে প্রথমে ছনের ছাউনি দিয়ে মসজিদটি গড়া হয়। চট্টগ্রামের তৎকালীন শাসক থানাদার ওয়াসিন চৌধুরী এ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর দাদা শেখ নাছির উদ্দিন তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের গৌড় এলাকা থেকে এ এলাকায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে এসেছিলেন। শেখ নাছির উদ্দিন এলাকার মুসল্লিদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে মসজিদটি প্রতিষ্ঠার জন্য বলেন। ওয়াসিন চৌধুরীর পিতা একজন ইবাদত-বন্দেগি সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। বুড়ো বয়সে মসজিদে নামাজ-জিকির-আজকারে দিনরাত কাটিয়ে দিতেন। আধ্যাত্মিক সাধনায় তিনি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতেন। ইবাদতে তিনি এতই মশগুল থাকতেন যাতে তাকে সবাই বুড়ো হুজুর নামে ডাকতেন। ইবাদত করতে করতে তিনি একদিন এই মসজিদ থেকে গায়েব (অদৃশ্য) হয়ে যান। তাই তাঁর নামানুসারে এটি ‘বুড়ো মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রথমে অল্প কজন মুসল্লি নামাজ পড়ার মতো জায়গা নিয়ে পাতার বেড়া এবং ওপরে দুনালি ছন দিয়ে মসজিদের প্রথম ঘর নির্মিত হয়। ২০-২৫ বছর পর্যন্ত এভাবেই চলে আসছিল মসজিদের কার্যক্রম। সে সময় সাপ, বাঘ ও জলময় ছিল ওই এলাকা। ফলে বাঘের ভয় ও ঝোপ-ঝাড়ের মাঝে অবস্থিত হওয়ায় এ মসজিদে মুসল্লিরা রাতে নামাজ আদায় করতে পারতেন না। নিরাপদ দূরত্বে থেকে মুসল্লিরা আজান দিয়ে চলে যেত। পরে চারপাশে বাঁশের বেড়া এবং ওপরে ছনের ছাউনি দিয়ে ১০-১৫ হাত দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের মসজিদ নির্মাণ করা হয়। ১৮৮৬ সালে ভূমিকম্পের কারণে বেড়া ও ছনের ছাউনি ঘর ভেঙে যায়। ভাঙা অবস্থায়ও জোড়াতালি দিয়ে আরও ২০-২৫ বছর চলে। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে মসজিদের কিয়দংশ পাকা করা হয়। ১৯৪০ সালে মসজিদের পুরোনো ভিত্তি ভেঙে নতুন করে ছাদ জমিয়ে পাকা করা হয়। ১৯৭৪ সালে ৫০০-৬০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা করে মসজিদ সংস্কার-সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯৭৫ সালে মসজিদের পাকা ভবনের গেট নির্মিত হয়। ১৯৮৬ সালের দিকে দ্বিতীয় তলায় উন্নীত করা হয়।