নড়াইলে কালের সাক্ষী হয়ে ১৫০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সর্বমঙ্গলা কালীমন্দির। নড়াইলের প্রতাপশালী জমিদারদের যে কটি স্থাপত্যকর্ম এখনো টিকে আছে তার মধ্যে সর্বমঙ্গলা কালীমন্দিরটি অন্যতম। নড়াইল শহরের সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের দক্ষিণপাশের সড়ক হতে কয়েকশো মিটার পশ্চিমে পুলিশ লাইনের কোল ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্য স্থাপনা সর্বমঙ্গলা কালীমন্দির। প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো সবুজ শ্যামল গাছগাছালি ঘেরা চোখ ধাঁধানো ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন মন্দিরটিতে এখনো ভক্তিভরে পূজা-অর্চনা করা হয়।
মন্দিরের শ্বেত প্রস্তরফলকে খোদিত লিপিপাঠের মাধ্যমে জানা যায়, নড়াইল জমিদার পরিবারের অন্যতম ব্যক্তিত্ব রামরতন রায়ের পুত্র জমিদার কালীপ্রসন্ন রায় ১৮১২ শতাব্দ তথা ১৮৯০ সালে এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরের কারুকাজ, আকৃতি ও গম্বুজসহ নকশা সবকিছুই তৎকালীন জমিদারের শৌখিনতার ছোঁয়ায় এটি নির্মাণ করা। চিত্রকলা শিল্পীদের সুনিপুণ স্থাপত্যশৈলীর ছোঁয়ায় এ ইমারতটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। মন্দিরটির অভ্যন্তর ও বহির্ভাগের দেয়ালের গায়ে পাথর দ্বারা আবৃত এবং বহির্দেয়াল গায়ে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে অলংকৃত। পাথর খোদাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর উপস্থাপন মন্দিরটিকে অনন্যতা দান করেছে। মন্দিরের দেয়ালের কোণাগুলো খাঁজ নকশায় অলংকৃত। বেদির চারপাশ আয়তাকার খোপ নকশা এবং এর কোণাগুলো ফুলের অনুকৃতিতে সুসজ্জিত। গর্ভগৃহ (মন্দিরের প্রধান দেবতার মূর্তির অবস্থান) ও বারান্দার বেদির কার্নিসের নিচের দিকে ঝুলে থাকা সারিবদ্ধ পত্র নকশা অত্যন্ত সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে রচিত হয়েছে। মন্দিরের দেয়ালের গায়ে প্রতিটি অংশ প্যানেলে বিভক্ত এবং এগুলো বিভিন্ন আকৃতির প্রস্তরফলকে সজ্জিত। ফলকসমূহের চারপাশ খোদাইকর্মের মাধ্যমে জ্যামিতিক নকশায় অলংকৃত। খিলান পথে স্থান পেয়েছে গিটার ও তবলা হাতে একজন সাধুর প্রতিমূর্তি। মূর্তিটির ডানে ফুল ও ফলে সমৃদ্ধ একটি বৃক্ষ সাধুর মাথার ওপরে ঝুলন্ত অবস্থায় উপস্থাপিত। মানবমূর্তির উভয়পাশে স্থান পেয়েছে একটি করে সিংহের অনুকৃতি। মন্দিরের উপরিভাগের রত্নগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে নির্মিত। গর্ভগৃহ ও বারান্দার মেঝে শ্বেত ও কালো প্রস্তরের জ্যামিতিক (বর্গাকার) নকশায় শোভিত। মন্দিরটিকে বাংলাদেশে বিদ্যমান এ ধরনের স্থাপত্যের একমাত্র উদাহরণ বলে মনে করা হয়। মন্দিরটি গঠন ও অলংকরণ বৈশিষ্ট্যে মুসলিম স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষণীয়। বিশেষ করে ছোটো সোনা মসজিদের প্রস্তর খোদাইয়ের সঙ্গে এই মন্দিরের প্রস্তর কারুকার্যে মিল লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং গঠনশৈলী ও অলংকরণ বৈশিষ্ট্যে এটি মুসলিম স্থাপত্য দ্বারা প্রভাবিত এবং দেশজ উপাদানে সমৃদ্ধ একটি ইমারত। সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পুরোহিত রতন ভট্টাচার্য বলেন, বাহারি কারুকাজ আর সুনিপুণ স্থাপত্যশৈলীর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নড়াইল জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত সর্বমঙ্গলা কালীমন্দিরটি ভক্ত অনুরাগী আর দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখরিত থাকে। এ ছাড়া মনোরম পরিবেশে মনের বাসনা পূরণ করতে প্রতিদিন অসংখ্য ভক্তের আগমন ঘটে এখানে।