তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য। ইসলামের মূল ও মৌলিক স্তম্ভ কালেমার সারমর্ম হচ্ছে তাওহিদ বা একত্ববাদ। ইসলাম মানুষকে সর্বপ্রথম তাওহিদের প্রতি আহবান জানায়। মুমিনের জীবনধারা নিয়ন্ত্রিত হয় একত্ববাদের শিক্ষার আলোকে।
আল্লাহর সঙ্গে বিশ্বের সর্বপ্রথম সম্পর্কই তাওহিদ। মহান আল্লাহ ইহলোকিক ও পারলৌকিক জগতে যাবতীয় বিষয়ের কেন্দ্রস্থল। পার্থিব-অপার্থিব জগতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হবে, সব সৃষ্টির অধিকারী হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ।
মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক জীবন থেকে তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন পর্যন্ত সর্বত্র গড়ে উঠে এক পূর্ণ সাযুজ্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই মানুষ হয় এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর বান্দা, অসংখ্য প্রভুর গোলামির দাবি অগ্রাহ্য করে তার উত্তরণ ঘটে এক পূর্ণ স্বাধীন মানবসত্তায়।
পবিত্র কোরআনে বিবেকসম্মত ও বৈজ্ঞানিক দলিলাদির পর্যালোচনা করে আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। এ ছাড়া আছে প্রকৃতির দলিল। আল্লাহ একত্ববাদের কয়েকটি প্রমাণ নিম্নরূপ :অনুভবে আল্লাহর প্রমাণ : মানুষের অন্তর আল্লাহপ্রবণ।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানুষ অন্তর দিয়ে একজন স্রষ্টাকে—মহান আল্লাহকে অনুভব করে। এই অনুভব প্রতি মুহূর্তেই হোক কিংবা দীর্ঘ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে। মানবমনের এই আল্লাহমুখিতা ও আল্লাহপ্রবণতা আল্লাহর একত্বের একটি প্রমাণবিশেষ।
নিয়ম-শৃঙ্খলাভিত্তিক প্রমাণ : এ বিশাল সীমাহীন বিশ্বলোক এবং তার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। রাত-দিনের বিবর্তন, প্রতিদিন একই নিয়মে সূর্য উঠা, সূর্য অস্তমিত হওয়া—জগতের সব কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও সিস্টেমের অধীনে চলাচল করা কোনো মহাশক্তিধরের শৃঙ্খলের প্রমাণ বহন করে।
এ শৃঙ্খলা-নিয়ম বিশ্বের প্রতিটি বস্তু ও অণুকে গ্রাস করে। কোনো কিছু এই নিয়মের বাইরে নয়। এ ধরনের চিরস্থায়ী নিয়ম-শৃঙ্খলা এক মহাপরিচালক মহানিয়ন্ত্রক শক্তিসমপন্ন সত্তা ছাড়া কল্পনা করা যায় না।
ভারসাম্য ও সুসংবদ্ধতার প্রমাণ : প্রাণী ও জীবজগতে জন্তু-জানোয়ার ও উদ্ভিদের ভারসাম্যতা ও সুসংবদ্ধতা আল্লাহর একত্ব প্রমাণ করছে। কোরআনে পাকের বহু স্থানে আল্লাহর একত্বের প্রমাণ পেশ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি শক্তিধর, প্রজ্ঞাময়। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। তিনি সব কিছু করতে সক্ষম। তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনিই প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান এবং তিনি সব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ১-৩)
দুই স্রষ্টা থাকলে যে অসুবিধা হতো
যদি তর্কের খাতিরে এ কথা মেনে নেওয়া হয় যে একাধিক সৃষ্টিকর্তা আছেন, তাহলে এ বিষয়টিও মেনে নিতে হবে যে তাদের সবাই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। তারা প্রত্যেকেই স্বীয় ইচ্ছা কার্যকর করতে পারেন। এ অবস্থায় তাদের একজন যদি সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, অন্যজন তা না চাইলে একই সময়ে সূর্যকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করবেন। একজন যদি দিনের পর রাতের আবর্তন কার্যকরী করেন, অন্য একজন ইচ্ছে করলে চিরকালের জন্য দিন করেই রাখতে পারেন। একজন যদি বর্ষাকালের সূচনা করেন, অন্যজন একই সময়ে বসন্তকালের সূচনা করতে পারেন। একজন যদি নারীর গর্ভে সন্তান দান করেন অন্যজন পুরুষের গর্ভেও ইচ্ছে করলে সন্তান দান করতে পারেন। সুতরাং এ ক্ষেত্রে এটি সুসপষ্ট যে একাধিক সৃষ্টিকর্তা বিদ্যমান থাকলে নিখিল বিশ্বে শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি হবে, পরিণামে এ বিশ্বজগতের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহ এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেই পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘যদি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্য থাকত, তাহলে উভয়ের ধ্বংস সাধিত হতো। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ২২)
মানুষ তার চারপাশে বিরাজমান বিশ্বজগতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পায় যে সৃষ্টির আদি থেকেই নিখিল বিশ্বের সব কিছু একই নিয়মে চলে আসছে। যেমন—সূর্য অনাদিকাল থেকে একই নিয়মে উদিত হচ্ছে এবং অস্ত যাচ্ছে। দিনের পর রাতের আগমন একই নিয়মে হচ্ছে। অন্য কথায় কোনো ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম ঘটছে না। সৃষ্টিজগতের নিয়মের রাজত্বে কোথাও কোনো অনিয়ম নেই, নেই কোনো বিশৃঙ্খলা। এ নিয়মের ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই।
আবার যদি যুক্তির খাতিরে এ কথা বলা হয় যে একাধিক সৃষ্টিকর্তা আছেন, তবে তাঁদের কেউ সর্বগুণে গুণান্বিত নন। প্রত্যেকেই বিশেষ একটি গুণের অধিকারী। অন্য কথায় একজনের যে গুণ আছে অন্যজনের তা নেই। যেমন যিনি সৃষ্টি করেন, তাঁর ধ্বংস করার ক্ষমতা নেই। আবার যিনি ধ্বংস করতে জানেন তাঁর সৃষ্টি করার ক্ষমতা নেই। যিনি লালন-পালন করেন, তাঁর সৃষ্টি বা ধ্বংসের কোনোটারই ক্ষমতা নেই। বস্তুত এ ধরনের খণ্ডিত ক্ষমতাধর কোনো সত্তা কখনো নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা হতে পারে না। এ বিষয়টি থেকে সুস্পষ্ট ত্রুটিপূর্ণ কোনো সত্তা স্রষ্টা হতেই পারে না। বস্তুত আল্লাহর অস্তিত্ব স্বতঃস্ফূর্ত। এতে কোনো রূপ অস্পষ্টতার স্থান নেই।
মহান আল্লাহ তাঁর সত্তায় ও গুণাবলিতে একক অদ্বিতীয়। তাঁর সঙ্গে কাউকে তুলনা করা যায় না। তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য আসমান-জমিনে, সাগর-ভূধরে, প্রতিটি সৃষ্টিলোকে। তাঁর একচ্ছত্র শক্তিতে কারো অধিকার নেই। কর্মে, গুণে, মর্যাদায় তথা সর্ব বিষয়ে তিনি অদ্বিতীয় ও অতুলনীয়।
তাই তাওহিদ বা একত্ববাদের শাশ্বত বাণী—‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই।’ আর এটাই তাওহিদের মূল বিষয়।