নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনী পাস করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। সংশোধিত আইনে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর করা হয়েছে। বলাৎকারের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ধর্ষণ মামলার বিচার ত্বরান্বিত করতে নতুন দুটি ডিএনএ ল্যাব প্রতিষ্ঠাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বিষয়টি জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম। এ সময় ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও অপূর্ব জাহাঙ্গীর উপস্থিত ছিলেন। প্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশকে নারীদের জন্য অন্যতম নিরাপদ একটা দেশ করতে সব চেষ্টা করা হচ্ছে। আইনের সংশোধনী নিয়ে গত কয়েক দিনে আমরা অনেক নারী সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের মতামতগুলো আমলে নেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। গতকাল উপদেষ্টা পরিষদে আইনটা নিয়ে ঘণ্টাখানেক আলোচনার পর তা পাস হয়। ধর্ষণ মামলাগুলো বিলম্বিত হওয়ার ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টের একটা বড় ভূমিকা ছিল। এজন্য নতুন দুটো ডিএনএ ল্যাব স্থাপনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদিকে উপদেষ্টা পরিষদ ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জানিয়ে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অধিকতর কার্যকর করার লক্ষ্যে আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুপারিশের আলোকে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়। খসড়া নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ, দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, মানবাধিকার সংস্থা, আইন বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের উল্লেখযোগ্য মৌলিক বিধানের মধ্যে রয়েছে- ধর্ষণের সংজ্ঞা সংশোধন; প্রণয়ের সম্পর্ক থাকাকালে বিয়ের প্রলোভন বা অন্যবিধ প্রতারণার মাধ্যমে যৌনকর্ম করার দণ্ড প্রদান; শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন ইত্যাদি। অধ্যাদেশটি জারি করা হলে ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর অধীন অন্যান্য অপরাধগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর আগে গত ১৭ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, সংশোধিত অধ্যাদেশে শুধু শিশু ধর্ষণ মামলার আলাদাভাবে বিচার করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের বিধান রাখা হচ্ছে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সম্মতিক্রমে ধর্ষণ আলাদা অপরাধ। সম্মতি ছাড়া ধর্ষণের ঘটনাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিচার এবং তদন্তের সময় কমানো হয়েছে। মামলার সংজ্ঞা পরিবর্তন করে শুধু পুরুষ কর্তৃক নয়, যে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণকে শাস্তিযোগ্য করা হচ্ছে। ডিএনএ রিপোর্ট ছাড়াই আদালত যদি মনে করে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষীর ভিত্তিতে বিচার করা সম্ভব, তাহলে আদালত বিচার করতে পারবেন।
এদিকে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে গতকাল প্রেস সচিব বলেন, কয়েকটি কোম্পানি সিন্ডিকেট করে সরকারি টেন্ডারগুলো পাচ্ছিল। এজন্য সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হয়েছে। প্রাক্কলিত মূল্যের ১০ পার্সেন্টের কম হলে টেন্ডার প্রস্তাব বাতিলের বিধান বাতিল করা হয়েছে। পূর্বের কাজের মূল্যায়নের জন্য যে ম্যাট্রিক্স ছিল, যেটা থাকার কারণে একই প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পেত, তা বদলে নতুন সক্ষমতা ম্যাট্রিক্স করা হবে। বর্তমানে ৬৫ শতাংশ কাজের দরপত্র বা টেন্ডার অনলাইনে হচ্ছে। এটিকে শতভাগে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া পাবলিক প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে কারা কারা কাজ পাচ্ছে, তাদের স্ট্যাটাস জানাতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তা ছাড়া পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দপ্রাপ্তরা পূর্বে নিজ নামে নামজারি করতে পারতেন না। সেই অসুবিধা দূর করতে আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। এ ছাড়া জনসাধারণের সুবিধার্থে নির্বাহী আদেশে ৩ এপ্রিল এক দিন ঈদের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। চৈত্রসংক্রান্তিতে নির্বাহী আদেশে তিন পার্বত্য জেলায় সাধারণ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, জৈন্তাসহ সমতলের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও এ ছুটির আওতায় থাকবে।
সরকারি দপ্তরে দ্রুত নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব বলেন, সরকারি দপ্তরে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার পদ খালি আছে বলে গতকাল ক্যাবিনেটে জানানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা জনপ্রশাসন সচিবকে এসব পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে আরও বিস্তারিত জানাতে বলেছেন। প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর প্রসঙ্গে শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশ থেকে আম, কাঁঠাল ও পেয়ারা বড় আকারে নিতে চায় চীন। এক্ষেত্রে চীনে রপ্তানির একটা বড় জায়গা তৈরি হবে। প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরে এ ব্যাপারে বড় সফলতা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। উপ প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, আগামী শনিবার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন এ মাসের মধ্যেই প্রতিবেদন দেবে বলে আশা করছি। ক্রীড়াঙ্গনে সংস্কারের জন্য এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের যে অ্যাডহক কমিটিগুলো ছিল, সেগুলো পরিবর্তনের জন্য একটা সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গতকাল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সার্চ কমিটির জন্য ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।