আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য কৃচ্ছ্রসাধনের অন্যতম অবলম্বন হিসেবে উপবাসব্রত পালনের প্রথা সুপ্রাচীনকাল থেকেই প্রায় সব সমাজ, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পরিপালিত হয়ে আসছে। ইতিহাসে এবং ধর্মগ্রন্থগুলোতে দেখা যায় বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃচ্ছ্রধর্মী আনুষ্ঠানিকতা পালনের রেওয়াজ রয়েছে। আল কোরআনে যেমন বলা হয়েছে- ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম সাধনার বিধান দেওয়া হলো যেমন বিধান ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর (কামা কুতিবা আলাইকুম)’। তবে এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে, ইসলামের সিয়াম সাধনা সময়সীমা, দিন, সংখ্যা পদ্ধতি ও অন্যান্য বিবেচনার বৈশিষ্ট্যে পূর্ববর্তী সময় ও সম্প্রদায়ের উপবাসব্রত পালনের থেকে নানান কারণে ভিন্নতর। আল্লামা ইউসুফ আলীর ভাষ্যমতে- ‘As it was prescribed: this does not mean that the Muslim fast is like the other fasts previously observed in the number of days in the time or manner of the fast, or in other incidents, it only means that the principle of self denial by fasting is not a new one. ‘পূর্ববর্তী সময়ের কিংবা অন্যান্য ধর্মের উপবাসব্রত হতে ইসলামের সিয়াম সাধনা সময়সীমা, দিন, সংখ্যা, পদ্ধতি ও অন্যান্য বিবেচনায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।’
অন্যান্য ধর্মে উপবাসব্রত পালনের বার্ষিক সময়সূচি বিক্ষিপ্ত অর্থাৎ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। কিন্তু ইসলামে পবিত্র রমজান মাসকে আবশ্যকীয়ভাবে রোজা পালনের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রমজান হলো হিজরি বর্ষের নবম মাস। আল কোরআনের অনুবাদক ও ভাষ্যকার জর্জ সেল অন্যান্য ধর্মাবলম্বি সৌরবর্ষের দিনক্ষণ নির্ধারণের পরিবর্তে রোজা চান্দ্রমাসে নির্দিষ্টকরণকে শুভ তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, আরবি চান্দ্রবর্ষ যেহেতু প্রতি ৩৩ বছরে সব ঋতুতে ঘুরে আসে, সেহেতু গ্রীষ্ম কিংবা শীত সব ঋতুতে কৃচ্ছ্রসাধনের সুযোগ প্রত্যেকের ভাগ্যে জোটে। এই প্রসঙ্গে একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক মন্তব্য করেছেন, রোজা ঘুরে ঘুরে আসে এবং প্রতি বছর পূর্ববর্তী মাস হতে এগিয়ে আসে। ফলে কখনো তা গ্রীষ্মকালে পড়ে, কখনো বা শীতকালে। কখনো উত্তপ্ত কিংবা শীতল ঋতুতে, কখনো দীর্ঘতম দিনগুলোতে, কখনো ক্ষুদ্রতম দিনগুলোতে। বছরের বিভিন্ন ঋতুতে রোজা পালনের ফলে কৃচ্ছ্রসাধনের উপলব্ধিতে সমতা সংস্থাপিত হয়। মানুষের গড় আয়ুষ্কাল বিবেচনা করলে অধিকাংশ মুসলমানের জীবনে গোটা বছর রোজা পালনের সুযোগ আসে। বিভিন্ন ঋতুতে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা উপলব্ধির মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ মেলে। অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলামের রোজা কোনো প্রকার দৈহিক শাস্তিমূলক কিংবা শোকের বার্তাবহ নয় (যেমন ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মে), বরং এই রোজা পালনের মাধ্যমে একজন মুসলমান অনির্বচনীয় আনন্দ লাভ করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য তাঁর নৈকট্য লাভের আশায় যে রোজা পালন সেই রোজা পালনের মধ্যে রোজাদারের জন্য বিশেষ কল্যাণ রয়েছে বলে আল কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে। সেই কল্যাণ তার আত্মার, তার শরীরের ও মনের। রমজান মাসের ৩০ দিন আবশ্যকীয় রোজা ও শাওয়াল মাসের ছয় দিন সুন্নত রোজা, মোট ৩৬ দিন রোজা পালনের মধ্যে সারা বছরের রোজা পালনের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। একটি পূণ্য কাজের জন্য আল্লাহ ১০টি নেকি দান করেন। ৩৬ দিনের রোজা ৩৬ ^ ১০=৩৬০ দিনের সওয়াব বহন করে আনে। বছরের বাকি পাঁচ দিন রোজা রাখা হারাম বা নিষিদ্ধ (দুই ঈদের দুই দিন ও কোরবানি ঈদের পরবর্তী তিন দিন) ৩৬ দিন বছরের ১০ ভাগের একভাগ। সুতরাং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা।
[সাবেক সচিব। এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান]