পাঁচ দফা দাবিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা। গতকাল সকাল থেকে ইনডোর ও আউটডোর বন্ধ থাকায় সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, বরিশালসহ বিভাগীয় ও জেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গেছেন রোগীরা।
এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না বলে দেওয়া হাই কোর্টের রায়ের পর আরও চার দাবি পূরণে মাঠে নেমেছেন চিকিৎসকরা। গত মঙ্গলবার ‘সর্বস্তরের চিকিৎসক ও চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের’ ব্যানারে দিনভর কর্মসূচি পালনের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলনে কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, টিকিট কাউন্টারের সামনে মানুষের দীর্ঘ লাইন। কিন্তু টিকিট কাউন্টার বন্ধ। কয়েক শ রোগী ভিড় করে থাকলেও মিলছে না সেবা। মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলেন সালেহা বানু। তার ছেলে আমিনুল ইসলাম বলেন, তিন মাস আগে স্ট্রোকের কারণে মায়ের শরীরের ডান পাশ অচল হয়ে গেছে। সম্প্রতি আরও কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকের কাছে এসেছিলাম। কিন্তু এসে শুনি সেবা বন্ধ। এরকম অসুস্থ, বয়স্ক মানুষকে কত কষ্ট দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালেও বন্ধ ছিল ইনডোর-আউটডোর সেবা।
এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না বলে গতকাল রায় দিয়েছেন হাই কোর্ট। পাশাপাশি ‘ডিএমএফ’ ডিগ্রিধারীদের (ডিপ্লোমাধারী হিসেবে নিবন্ধিত) ক্ষেত্রে যথাযথ প্রিফিক্স (নামের আগে ব্যবহার করা সম্মানসূচক শব্দ) নির্ধারণে ছয় মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাই কোর্টের রায়ের মাধ্যমে একটি দাবি পূরণ হলেও বাকি চার দাবি আদায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন চিকিৎসকরা।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মহাসমাবেশের পর সচিবালয়ের পথে দোয়েল চত্বরে যেতেই বাধা দেয় পুলিশ। কিন্তু বাধা উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগোতে থাকেন চিকিৎসকরা। পরে হাই কোর্ট মোড় হয়ে শিক্ষা ভবনের সামনে গেলে সেখানে আগে থেকেই দেওয়া পুলিশের ব্যারিকেডে আটকে যায় আন্দোলনরত চিকিৎসকদের পদযাত্রা। পরে বৈঠকের জন্য ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে যায়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিসের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. হাবিবুর রহমান সোহাগ। চিকিৎসকদের বাকি চার দফা হলো- উন্নত বিশ্বের চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসি ড্রাগ লিস্ট আপডেট করতে হবে। এমবিবিএস বা বিডিএস ছাড়া অন্য কেউ ওটিসি লিস্টের বাইরের ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারবে না। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসিগুলো ওটিসি লিস্টের বাইরের কোনো ওষুধ বিক্রি করতে পারবে না।
স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকের সংকট নিরসনে দ্রুত ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে সব শূন্যপদ পূরণ করতে হবে। আলাদা স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করে আগের মতো সপ্তম গ্রেডে নিয়োগ দিতে হবে। প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। চিকিৎসকদের বিসিএসে বয়সসীমা ৩৪ বছর করতে হবে। সব মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল (ম্যাটস) ও মানহীন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো বন্ধ করতে হবে। এরই মধ্যে পাস করা ম্যাটস শিক্ষার্থীদের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদবি রহিত করে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তায় চিকিৎসক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো আরও খবর-
বরিশাল : পাঁচ দফা দাবিতে সারা দেশের মতো বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করেছেন। গতকাল সকাল ৯টা থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর।
তিনি জানান, পাঁচ দফা দাবিতে সারা দেশের সঙ্গে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এবং ওটিসহ অভ্যন্তরীণ চিকিৎসাসেবা চালু আছে।
রাজশাহী : উচ্চ আদালতের রায়ের পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ চত্বরে আনন্দ মিছিল করেছেন চিকিৎসকরা। সকাল থেকে রায়ের অপেক্ষায় জরুরি বিভাগের সামনে সেবা বন্ধ করে অবস্থান নেন চিকিৎসকরা। দুপুরে রায় তাদের পক্ষে আসায় তাৎক্ষণিক মিছিল বের করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা. মনোয়ার তারিক সাবু জানান, চিকিৎসকদের ডাকা শাটডাউন কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। চিকিৎসকরা আবার নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। সাময়িক অসুবিধা হওয়ায় তিনি রোগীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
রংপুর : রংপুরে কর্মবিরতি পালনসহ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশে নেমেছেন ইন্টার্ন ও ট্রেইনিং চিকিৎসকসহ সর্বস্তরের চিকিৎসক। ফলে বন্ধ রয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা। গতকাল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে টিকিট কাউন্টারগুলো বন্ধ। কাউন্টারের ভিতরে কেউ নেই। কোনো চিকিৎসকও বসেননি। ফলে দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। বিএমডিসি থেকে ম্যাটস শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করা, শূন্যপদে চিকিৎসক নিয়োগসহ পাঁচ দফা দাবিতে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন।
চট্টগ্রাম : ম্যাটস ও ডিএমএফ ইস্যুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল কর্মবিরতি ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। সকালে চমেক একাডেমিক ভবনের সামনে ইন্টার্ন চিকিৎসক কাউন্সিলের ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের। এ সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ছাড়া সব ধরনের সেবা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, এতদিন আন্দোলন চলমান থাকার পরও যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। যা খুবই দুঃখজনক।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে আছে- বিএমডিসির নিবন্ধন ব্যতিত কেউ ‘ডাক্তার’ লিখতে না পারা, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ওটিসি ড্রাগ লিস্ট আপডেট করা, স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকদের সংকট নিরসন করা, ম্যাটস ও নিম্নমানের মেডিকেল বন্ধ করা এবং চিকিৎসক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করা।
এদিকে চিকিৎসকদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোর সেবা বন্ধ রয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, বৈকালিক সেবাও বন্ধ রাখা হবে। তবে চমেক হাসপাতালের আইসিইউ, সিসিইউ, ক্যাজুয়ালটি বিভাগ, অ্যাডমিশন ইউনিট এবং লেবার ওয়ার্ড চালু থাকবে, যাতে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত না হয়। এরপর রোগীদের নানাভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার : ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিস (ডিএমজে) নেত্রী নাজিয়া আলী বলেন, মোট ১৯টি চিকিৎসক সংগঠন মিলে সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করেছে। ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রি ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবে না বলে হাই কোর্টের রায় আসার পর ১৮টি সংগঠন কর্মবিরতি কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে।