এক গ্লাস দুধ নষ্ট করতে যেমন এক ফোঁটা চুনই যথেষ্ট। একটি দুষ্ট বানরই যেমন সাজানো বাগান তছনছ করার জন্য যথেষ্ট, তেমন একটি বিরাট অর্জন ধ্বংস করতে পারে মাত্র একটি বিচ্যুতি। জুলাই বিপ্লবের সব অর্জন ইদানীং যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে ‘মব’ নামের উচ্ছৃঙ্খলতা। মঙ্গলবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যায় বন ও পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘সরকার মব জাস্টিস বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ ধরনের মব জাস্টিস বন্ধের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ উপদেষ্টা যেদিন এ সংবাদ সম্মেলন করলেন সেদিন মধ্যরাতের পর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে অতর্কিত আক্রমণ চালাল কিছু দুর্বৃত্ত। তারা নিজেদের ‘ছাত্র-জনতা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে নির্বিচারে ফ্ল্যাটের তালা ভাঙল, তছনছ করল, লুটপাট করল। এক ঘণ্টার বেশি চলল এ লুণ্ঠন। তাদের সমস্ত তা ব যখন শেষ হলো সেই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে প্রবেশ করলেন। তারা এ দুর্বৃত্তদের সঙ্গে বৈঠক করলেন এবং তাদের নির্ভয়ে নিরাপদে প্রস্থানের সুযোগ করে দিলেন। দুর্বৃত্তরা প্রস্থানের পথে চিৎকার করে বলেছিল, তারা শুনেছে যে এখানে এইচ টি ইমামের ছেলে তানভীর ইমামের অবৈধ সম্পদ রয়েছে। এ কারণে তারা এসেছিল। যদি কেউ শুনেই থাকেন কোনো অপরাধী অবৈধ সম্পদ কোনো ফ্ল্যাট বা বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছে, তাহলে তিনি কী করবেন? তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলবেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় এসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত না করে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে ভয়ংকর প্রবণতা, যাকে আমরা এখন বলছি ‘মব জাস্টিস’, সেটির আরেকটি ভয়ংকর রূপ মানুষ দেখল গুলশানে। জনগণের তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পর ‘ছাত্র-জনতা’ নামধারী ডাকাত দলের মাত্র তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ পুলিশের নাকের ডগায় এটা ঘটেছে। তারা লুটপাট করেছে কি না সেটি বাদ দিলাম। তারা যে একটি বাড়িতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে, তালা ভেঙেছে, এটি বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে দ নীয় অপরাধ। শুধু একটি নয়, এ রকম ঘটনা এখন প্রতিনিয়তই ঘটেই যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এর মধ্যে ঢাকার খবর আমরা জানছি, কিন্তু অধিকাংশ জেলার খবর আমাদের অগোচরে থেকে যাচ্ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে গত আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৯৬টি। গত সাত মাসে বিভিন্ন স্থানে মব জাস্টিস করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ২৩৩টি। কোনো জায়গা মব জাস্টিস থেকে মুক্ত নয়। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি, এমনকি নারীরা মব জাস্টিসের শিকার হচ্ছেন অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে। আর এসব যদি সরকার প্রতিরোধ করতে না পারে, তাহলে গণ অভ্যুত্থানের অর্জন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, আমাদের বিপ্লবের ফসল আমরা ঘরে তুলতে পারব না।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন এ দেশের ছাত্র-তরুণরা, তারা এ রকম নির্বিচার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, পাড়ায় মহল্লায় নতুন দানব তৈরি হওয়া চাননি। তারা চেয়েছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশে কেউ ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারবে না। কেউ কাউকে দমন করবে না, কেউ কাউকে নিষ্পেষণ করবে না। অর্থাৎ একটা নিষ্পেষণ এবং পরাধীনতামুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেই জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর আমরা দেখছি প্রতিনিয়ত নানা রকম মব জাস্টিসের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষণ, খুন, লুটতরাজ যেন এখন নিত্যকার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত সাত মাসে কিছু সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত তৈরি হয়েছে পাড়ায় মহল্লায়। অপরাধী চক্র এখন ‘ছাত্র-জনতা’র বেশে অপরাধ করছে। এ অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, জুলাই বিপ্লবের নায়কদের ইমেজ নষ্ট করছে। সমাজে তাদের সম্পর্কে ভুল ধারণা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এটা খুব ভয়ংকর প্রবণতা। গুলশানে যেভাবে একটি বাড়িতে নির্বিচার কয়েকজন দুর্বৃত্ত ঢুকে পড়েছিল, ঠিক তেমনভাবে বিভিন্ন স্থানে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে ইচ্ছামতো বিচার হাতে তুলে নিচ্ছে। যে কোনো নিরীহ মানুষের ওপর চড়াও হচ্ছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বাদ যাচ্ছেন না ‘মব জাস্টিস’-এর আক্রমণ থেকে। নৈরাজ্যকর এক মস্তানতন্ত্র তৈরি হয়েছে। আপনি যদি ২০-২৫ জন লোক জড়ো করতে পারেন, তা হলেই আপনি আপনার ‘চিহ্নিত শত্রুকে’ পথে ঘাটে ইচ্ছামতো পেটাতে পারবেন। আপনার এ অন্যায় বাধা দেওয়ার কেউ নেই এবং এ ২০-২৫ জনের সঙ্গে আরও হয়তো উৎসুক জনতা যুক্ত হবে; সব মিলিয়ে যেন পৈশাচিকতার উৎসব করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসেও দাঁড়িয়ে থাকবে। তারা বোঝার চেষ্টা করবে আসলে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে? ততক্ষণে যা ঘটার ঘটবে।
৪ মার্চ রাজধানীর ভাটারার জগন্নাথপুরে মব তৈরি করে ইরানের দুজন নাগরিকসহ তিনজনকে মারধরের ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ এ বিদেশি দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পুলিশ জানায়, ইরানের দুই আহত নাগরিক মোহাম্মদ আহমদ (৭৪) ও তাঁর নাতি মো. মেহেদি (১৮)। তাঁরা বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন। আহত অন্যজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি দুজন বিদেশি নাগরিককে তাঁর গাড়িতে এনেছিলেন। ঘটনার পরে তিনি পালিয়ে যান। এখন প্রশ্ন হলো, একজন বিদেশি যদি এ ধরনের ঘটনার শিকার হন, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? ৫ আগস্টের পর কিছু সুযোগসন্ধানী প্রথম এ ধরনের সুযোগ নেয়। তারা বুঝতে পারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কারও নিয়ন্ত্রণে নেই, দেশের পুলিশ বাহিনী অকার্যকর। কোথাও পুলিশ কাজ করছে না। এ রকম অবস্থায় তারা প্রথমে কিছু চিহ্নিত বাড়িঘর নির্বিচার লুটপাট করে। ৫ আগস্ট বিভিন্ন বাড়িঘরে যারা লুটপাট করেছে তারা কেউই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এটা আন্দোলনের কোনো চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা প্রকৃতই দুর্বৃত্ত এবং অপরাধী। যখন আস্তে আস্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া শুরু করে, পুলিশ কাজে নামা শুরু করে, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন এ সমস্ত অপরাধী ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করে। যেহেতু ছাত্ররা বিপ্লবের পর আলাদা একটি শক্তি হিসেবে এবং জনপ্রিয়তার দিক থেকে অন্য রকম একটি অবস্থানে আসীন হয়েছেন, সেজন্য এ ছাত্র-জনতার পরিচয়টি ব্যবহার করা শুরু করে দুর্বৃত্তরা। তারা বিভিন্ন বাড়িঘরে আক্রমণ করে এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির মাধ্যমে সমাজে অস্থিতিশীলতার চেষ্টা করছে। ধরা যাক, আপনার সঙ্গে একজন ব্যক্তির গন্ডগোল রয়েছে। আপনি একজন মস্তান ভাড়া করলেন এবং সেই মস্তান আরও কয়েকজনকে জড়ো করল, তারা নিজেদের ছাত্র-জনতা পরিচয় দিল, কেউ বা পরিচয় দিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা হিসেবে। কে যাচাই করবে আসলে তিনি কে? এইভাবে তারা একটি বাড়িতে, অফিসে, দোকানে কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আক্রমণ চালাল এবং ক্ষয়ক্ষতি করল। এ সমস্ত ঘটনায় বদনাম হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এবং অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দানকারী শিক্ষার্থীদের। আর এটি দ্রুত বন্ধ না করতে পারলে এ বিষয়টি জনগণের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কেই নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জুলাই বিপ্লবে যারা অগ্রণী সৈনিক ছিলেন বা জুলাই বিপ্লবে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন তারা কখনোই এ ধরনের দুর্বৃত্তায়ন, চাঁদাবাজি সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না। তারা নতুন বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা। ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের পরও একইভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্রহননের নানা ষড়যন্ত্র হয়। অপরাধীরা লুটপাট, ছিনতাই, রাহাজানি করে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় ব্যবহার করে। এর কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে জাতিকে। এ ষড়যন্ত্রকারী মহল সে সময় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করে সফল হয়েছিল। এখন জুলাই বিপ্লবের নায়কদেরও বিতর্কিত করার চক্রান্ত চলছে। মনে রাখতে হবে, জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। কাজেই তাদের ব্যবহার করে যারা এটা করছে, তারা আসলে ফ্যাসিবাদের দোসর, তারা আসলে স্বৈরাচারের সহযাত্রী। তারাই বাংলাদেশে স্বৈরাচার পুনর্বাসন করতে চায় এবং এ কারণেই তারা এ ধরনের কুৎসিত এবং অগ্রহণযোগ্য খেলায় মেতে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে দায়িত্বশীল এবং কঠোর হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ব্যাপারে নির্মোহ হতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। যারা আক্রমণ করেছে তারা আক্রমণকারী, তারা ছাত্র কি অছাত্র, জনতা কি দুর্বৃত্ত এটি দেখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়। অপরাধীকে নির্মোহভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। মব জাস্টিস যদি বন্ধ না হয় তাহলে এ বিপ্লবের অর্জন ব্যর্থ হয়ে যাবে। মব জাস্টিস এখন বিপ্লবের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লবের আবহ সৃষ্টি করছে এ মব জাস্টিস। মব জাস্টিস বন্ধ করার জন্য শুধু কথা নয়, কাজও দরকার।
অদিতি করিম : নাট্যকার ও কলাম লেখক
ইমেইল : [email protected]