বাড়িতে বড় একটা রেডিও ছিল। সেটাতেই একদিন শুনলাম মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা। বাড়ির সবাই একসঙ্গে শুনলাম, বেশ কয়েকবার, বাংলা ও ইংরেজিতে। মূলত, জিয়াউর রহমানের এই স্বাধীনতার ঘোষণার পরই মানুষ সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পায়। এই ঘোষণার পরই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। আমিও অনেকের মতো যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে যশোরের চৌগাছা উপজেলার মাসিলা সীমান্ত দিয়ে ভারতের আসামে চলে যাই। সেখানকার হাফলংয়ে মেজর মালহোত্রার অধীনে ১ মাস ১০ দিন ট্রেনিং নেই। এরপর আবার সেই চৌগাছার মাসিলা সীমান্ত দিয়েই সহযোদ্ধাদের নিয়ে যশোরে প্রবেশ করি। কিন্তু সীমান্ত পার হয়েই পাক সেনাদের অ্যাম্বুশের মধ্যে পড়ে যাই। রাতের অন্ধকারে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে এক পাক সেনাকে জাপটে ধরি। এ সময় বিশালদেহী সেই খান সেনা সজোরে পেটে আঘাত করলে পেছন দিয়ে রক্ত বের হয়ে যায়। এ অবস্থায় কাছে থাকা পিস্তল দিয়ে গুলি করে সেই খান সেনাকে হত্যা করি।
শ্যামনগরের ভয়াবহ এক সম্মুখ যুদ্ধের কাহিনি আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। একাত্তরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস, ঠিক মনে পড়ছে না। তবে তখন রোজার মাস ছিল এটা নিশ্চিত। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শ্যামনগর, সালতা, এনায়েতপুর, দীঘিরপাড় এলাকায় ছিল সাড়ে ৩ শ’ পাক সেনা। ভয়াবহ এই যুদ্ধে ৪৫ জন পাক সেনা নিহত হয়। আমাদের শহীদ হন দুজন মুক্তিযোদ্ধা, আহত হন পাঁচজন। পাক সেনারা পালিয়ে যাওয়ার সময় প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম ফেলে যায়। স্বাধীনতার পর দুই গাড়িভর্তি করে সেসব অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম সরকারের কাছে জমা দেই আমি ও সহযোদ্ধারা। শুধু পাক সেনাদের ফেলে যাওয়া দুরবিনটি স্মৃতি হিসেবে আজও নিজের কাছে রেখে দিয়েছি।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা
শ্রুতিলিখন : সাইফুল ইসলাম, যশোর