আমাদের দেশের অন্যতম সমস্যার নাম কিশোর অপরাধ। বয়স কম হওয়ায় কঠোর শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এদের অপরাধের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে বড়দেরও ছাড়িয়ে যায়। শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা বিশে^ই কিশোর অপরাধ এক বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কিশোরই নিজ থেকে অপরাধী হয় না। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী, সংস্কৃতি এসব দেখে সে প্রভাবিত হয়। এ বয়সে ভালোর চেয়ে খারাপ কিছুতেই মানুষ প্রভাবিত হয় বেশি। এ সময় কিশোররা পরিবারের বাঁধন খুলে ফেলতে চায়। বাবা-মায়ের কথার অবাধ্য হওয়ার চর্চা শুরু করে। মুরুব্বীদের কথা না শোনার বয়স এটা। তবে শিশু বয়স থেকে যদি সন্তানকে কুরআনের আলোয় গড়ে তোলা যায়, তাহলে কিশোর বয়সেও সে থাকে মা-বাবার অনুগত। পরিবারের প্রতি ব্যকুল। এ জন্য ছোট থেকেই তাকে নামাজ ও রোজায় অভ্যস্ত করানো প্রতিটি বাবা-মায়ের নৈতিক দায়িত্ব। নবিজিও (সা.) ঠিক এমনটিই বলেছেন। হাদিসের সার্মর্ম হল, প্রতিটি মানবশিশুই একটি সুন্দর ভবিষ্যত নিয়ে পৃথিবীর বুকে পা রাখে। কিন্তু চারাপাশের পরিবেশ এবং বাবা-মার দায়িত্বহীন আচরণ তার সুন্দর ভবিষ্যতকে অসুন্দর করে দেয়। তাই প্রতিটি বাবামাকেই খুব সচেতভাবে সন্তানপালন করা উচিত। চেষ্টা করার পরও যদি সন্তান বখে যায়, তার দায়িত্ব বাবা-মার নয়। দূর থেকে মানুষ বাবামাকে দোষ দিলেও কেয়ামতের দিন অন্তর্যামী আল্লাহ অবশ্যই বাবামাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না। সন্তান যেনো বখে না যায়, আর বাবামাকেও যেনো আল্লাহর আদালতে আসামী হতে না হয় এজন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মুহাম্মাদ (সা.) একটি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ছোট্ট বয়স থেকেই সন্তানকে ধর্মীয় অভ্যাসে গড়ে তোলো। তাহলে বড় হলে সে ধার্মিক এবং বাবামার বাধ্য সন্তান হবে। আরেকটি হাদিসে নবিজি বলেছেন, সাত বছর হলে সন্তানকে নামাজের উপদেশ দেবে। ১০ বছর হলে নামাজের জন্য শাসন করবে। মনে রাখবে, ছোট বয়সে যে অভ্যাসের ওপর সে গড়ে ওঠবে, বড় হলেও সে অভ্যেস রয়ে যাবে। (মিশকাত।)
প্রিয় পাঠক! সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতে জন্য কত কিছুই না আমরা করি। কিন্তু তার সুন্দর আখেরাতের জন্য কোনো প্রচেষ্টা কি আমরা করেছি? ছোট বয়স থেকে ধর্মীয় অভ্যাসে তাকে বড় করার কথা নবিজি বলেছেন। আফসোস! ছোট বয়সে তাকে সব করানো হয় শুধু ধর্মটুকু ছাড়া। পরীক্ষায় পাশ করার জন্য কত পরিশ্রম করতে বাধ্য করি সন্তানকে। হায়! তার সিকি ভাগও যদি আখেরাতের পরীক্ষার জন্য বাধ্য করতাম তাকে, তাহলে তার দুনিয়ার জীবন যেমন সুন্দর হত, আখেরাতের জীবনও আরো বেশি উজ্জল হত। এই যে রমজান মাস চলছে, ছোট ছোট সন্তানরা বায়না ধরে রোজা রাখার জন্য। আফসোস! বাবামা তাদের শখের রোজার বাধ সাধে। এভাবে পরিবার থেকেই সে ধর্ম না করার অভ্যেস রপ্ত করে। এই সন্তানই যখন বিশ্ববিদ্যালয় ওঠে চাঁদাবাজি করে, টেন্ডারবাজি করে, ধর্মের পথ ভুলে যায়, তখন বাবামাই বলে, কী এমন পাপ করলাম, আল্লাহ আমার সন্তানকেই নষ্ট করল। কোনো পাপ নয়, ছোট বয়সে তাকে ধর্মবিমুখ করার ফল বড় হয়ে সে বাবামাকে দেখাচ্ছে। এসব সন্তানই বাবামাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। হায়! বাবামারা যদি বুঝত! পাঠক! সন্তান আপনার। তাকে আল্লাহমুখী করে গড়ে তোলার আপনারই ইমানি দায়িত্ব। রোজার মাসে শিশুদের মনে রোজার জন্য এক ধরণের প্রেম জাগে। অবশ্যই এ প্রেমকে পুঁজি করে সন্তানকে ধর্মকর্মে অভ্যস্ত প্রতিটি বুদ্ধিমান বাবামার কর্তব্য। যারা এ সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করে সন্তানের ধর্মকর্মে বাধ সাধে, তাদের চেয়ে পোড়া কপাল বাবামা আর কে আছে? আল্লাহ আমাদের সন্তানদের ধর্মেকর্মে, জ্ঞানেগুণে সফল হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর, www.selimazadi.com