দেশে ব্যবসাবাণিজ্যে এখনো স্থিতিশীলতা আসেনি। একই সঙ্গে নতুন শিল্প স্থাপন আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। ঋণের সুদহার বৃদ্ধি, ব্যাংকে তারল্য সংকট, ডলারের উচ্চমূল্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে মূলধনি মেশিন পুরোদমে চালু করা যাচ্ছে না। কারখানার গ্যাসের দাম বাড়ায় অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে বাজারে টিকে থাকার সংশয় রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় কারখানা বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে। এমনকি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় নতুন শিল্প স্থাপন তো দূরের কথা, বর্তমানে চালু শিল্প টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বিনিয়োগের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ একটি অন্যতম উপকরণ। এ দুটিতেই সমস্যা প্রকট। গ্যাসের দাম বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গ্যাসনির্ভর বর্তমান শিল্পগুলো ধুঁকছে। নতুন শিল্প চালু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারে (শিল্পে ব্যবহৃত নিজস্ব বিদ্যুৎ) ৩০ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটারের দাম ৭৫ টাকা ৭২ পয়সা করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই দাম বাড়লে গ্যাসনির্ভর শিল্পে সংকট আরও বাড়বে। পাশাপাশি গ্যাসের খরচ বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে পণ্যের দামও বাড়বে। ব্যাংকে সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪ শতাংশ। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম কমে যাচ্ছে। ফলে বেশি দামে এলসি খোলা লাগছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় আগের তুলনায় ভ্যাট বাড়ায় স্থিতি আসেনি ব্যবসাবাণিজ্যে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আগের তথ্য-উপাত্ত বেশির ভাগই ভুল ছিল। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ ছিল। সে জায়গা থেকে ব্যবসার পুনরুদ্ধারের সুযোগ এসেছে। এর সঙ্গে চ্যালেঞ্জে বেড়েছে। ব্যবসাবাণিজ্যের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা জড়িত। এখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ বেশি হচ্ছে না। ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বিগত সময়ের তুলনায় কমে গেছে। ব্যবসাবাণিজ্যের স্বাভাবিক চলার গতি ধীর হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিগত সময়ের সমস্ত গ্যাপ পূরণ হবে। এ সরকারের কাছে আমরা পরিবর্তনটা আশা করি। বর্তমান সরকার যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত স্বতন্ত্রভাবে নিতে পারে। রাজনৈতিক দলের মতো তারা চিন্তা করবে না। ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়ী নীতি এ সরকারের কাছে আশা করছি। পরবর্তী সময়ে যারাই আসুক না কেন তারা যেন এ নীতিকে অনুসরণ করতে পারে।’
গাজীপুরের টঙ্গীর মাজুখানে এক্সক্লুসিভ ক্যান নামের কারখানায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রঙের ছোট-বড় ক্যান, আইসক্রিমের বক্স, ওষুধের বোতল তৈরি করে থাকে। এক্সক্লুসিভ ক্যান প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসির বলেন, ‘বর্তমান ব্যবসার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। এ সময় পাঁচটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গরমকালে বিদ্যুতের নিশ্চয়তা সরকার দিতে পারছে না। বর্তমানে গ্যাসের দাম বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়লে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাবে। আমরা যারা গ্যাস নিয়ে ক্যাপটিব জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকি, তাদের খরচ আরও বাড়বে। গ্যাস এবং বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায় পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে।’
সৈয়দ নাসির বলেন, ‘৯০ শতাংশ ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে। আগে ব্যাংকের ইন্টারেস্ট ছিল ৯ শতাংশ, এখন হয়েছে ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে আরও ইন্টারেস্ট বাড়াবে। ইন্টারেস্ট আরও বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রুগ্ণ হয়ে পড়বে। এ ছাড়া শেষ চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য এলে সে পণ্যের ইমপোর্ট ভ্যালুকে অ্যাসেট ভ্যালু ধরা হয় না। আমদানি পণ্যমূল্যের ওপরে লোড দিয়ে বেশি ট্যাক্স নিচ্ছে। অথচ অনলাইনেই এসব পণ্যের মূল্য যাচাই করা যায়।