সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো তিন ধাপে বা প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ নিয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এজন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে পাঁচ গবেষক। ব্যাপক সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসবে ঐকমত্য কমিশন। যেসব সংস্কারের ব্যাপকতা অনেক সেগুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও অন্য অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করবে অন্তর্বর্তী সরকার। শিগগিরই এ বৈঠক শুরু হবে। এ কমিশনের মূল দায়িত্ব সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় সংশোধন প্রস্তাব করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে তা বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা।
প্রথম ধাপে অতি জরুরি যেসব সংস্কার সুপারিশ তার তালিকা করা হচ্ছে। এটাকে কমিশন স্বল্পমেয়াদি হিসেবে চিহ্নিত করছে। বিশেষ করে সাংবিধানিক জটিলতা নেই এবং রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন সুপারিশগুলো এতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। মধ্যমেয়াদির তালিকায় প্রায় একই ধরনের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন কিছুটা সময় সাপেক্ষ। সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সুপারিশের তালিকায় যেসব রয়েছে তার জন্য সাংবিধানিক বিষয় বা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের প্রয়োজন। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন কমিশন রাজনৈতিক দলের ওপর ছেড়ে দিতে চায়। সুপারিশের মধ্যে আবার কিছু বিষয় বিধি আকারে অথবা অধ্যাদেশ আকারে জারি করে বাস্তবায়ন করতে চায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। সহসভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মনির হায়দারকে। বিশেষ সহকারী হিসেবে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শক্তির সঙ্গে লিয়াজোঁ এবং যোগাযোগ রক্ষায় ভূমিকা পালন করবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশনগুলোর প্রতিবেদনকে দুই ভাগে ভাগ করা হবে। যার এক ভাগে আশু সংস্কার এবং অন্য ভাগে থাকবে কাঠামোগত সংস্কার। যেগুলোর জন্য প্রক্রিয়াগত জটিলতা রয়েছে সেগুলো থাকবে। যে সংস্কারগুলো সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করতে পারবে সেগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে ইনফর্ম করে সংস্কার করা হবে। যে সংস্কারগুলো ব্যাপক সেগুলোর জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ও অন্য অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শুরু হবে।
কমিশনের কাজের রোডম্যাপ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের দেওয়া চূড়ান্ত সুপারিশগুলোর মধ্যে মিল ও অমিল বের করা হচ্ছে। যেমন নির্বাচন সংস্কার কমিশন বলছে, সংরক্ষিত ১০০ নারী আসন হবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে। অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার কমিশন বলছে, ৬৪ জেলাকে ১০০ আসনে বিভাজন করে নির্বাচনের মাধ্যমে সংরক্ষিত নারীরা নির্বাচিত হবেন। এগুলোকে কীভাবে সমন্বয় করা যায় তা নিয়ে কাজ করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তিনি বলেন, একইভাবে কেউ বলছেন অন্তর্বর্তী সরকার, কেউ বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আবার এর মেয়াদ নিয়েও রয়েছে কয়েকটি মত। কেউ তিন মাসের কথা বলছেন আবার কেউ বলছেন আরও বেশি। আবার এর সদস্য সংখ্যা নিয়ে কেউ বলছেন ১৫ জন আবার কেউ ২১ জন। এসব বিষয় সমন্বয়ের কাজ করা হচ্ছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে। সহসভাপতির দায়িত্ব পাওয়া আলী রীয়াজ নিয়মিত অফিস করছেন। সেখানে আপাতত কাজ করছেন মনির হায়দারও। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন- জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, পুলিশ সংস্কার কমিশন প্রধান সফর রাজ হোসেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন প্রধান বিচারপতি এমদাদুল হক, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৪০ সদস্যের একটি টিম কাজ করবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে। আপাতত সংবিধান সংস্কার কমিশনের ২৪ জন কর্মকর্তা ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের ১৭ জন কর্মকর্তা এতে কাজ করছেন। পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয়ের কয়েক কর্মকর্তাও নিয়মিত কাজ করছেন। এ ছাড়া পাঁচজন গবেষককে টিমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজনকে এরই মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য শিগগিরই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে আদেশ জারি করা হবে। যদিও ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কমিশনের কাজ শুরুর কথা থাকলেও লোকবল ও অফিস প্রস্তুত করতে সময় নেওয়া হচ্ছে।