মব জাস্টিস শুরু হয় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। দেশে এর আগেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বহু দেখা গেছে। সম্প্রতি ছিনতাই ও ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। সারা দেশেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মব জাস্টিসের নামে মারামারি, অত্যাচার কিংবা হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে স্পিডবোট নিয়ে ডাকাতি করতে গিয়ে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত হয় তিনজন। এ সময় ডাকাতরা গুলি ছুড়লে স্থানীয় আট ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় ট্রলার নিয়ে ধাওয়া করে গণপিটুনি দিলে আহত হয় সাত ডাকাত। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডাকাত দলের তিনজনের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনা ঘটে মাদারীপুরের সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের বিদ্যাবাগীশ ও পাশের শরীয়তপুর সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের তেঁতুলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায়। রবিবার মাদারীপুরে কীর্তিনাশা নদী থেকে আরেক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হন দুই যুবক। পরদিন তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনের ফুট ব্রিজ থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখার পর পুলিশ তাদের উদ্ধার করে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢামেকে স্থানান্তর করা হয়।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, একদল মানুষ ঝুলে থাকা দুই ব্যক্তিকে মারধর করছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনায় সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি, আইনের শাসনের প্রতি অনীহা এবং ভবিষ্যতে প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি করতে পারে। যেকোনো মূল্যে এসব ঘটনা ঠেকানো না গেলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একজনকে চোর সন্দেহে, অন্যজনকে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন হত্যাকাণ্ড নাড়া দেয় সব শ্রেণির মানুষকে। মনে করিয়ে দেয় বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। তবে এমন ‘মব জাস্টিস বা ‘উন্মত্ত জনতার বিচার’ নতুন নয়। এটাকে ‘বিচার’ বলতে চান না কেউ কেউ। বিচার একটি পজিটিভ শব্দ। কিন্তু মব জাস্টিসের নামে যেটা ঘটছে সেটা ভয়াবহ। যে বিচারের অর্থ হয়ে উঠেছে গণপিটুনি, অপমান, হত্যা কিংবা আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা। ২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় তসলিমা বেগম রেণু নামে এক নারী হত্যার ঘটনা মানুষ এখনো ভোলেনি। ২০১১ সালে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ১৭ জুলাই শবেবরাতের রাতে ঢাকার অদূরে সাভারের আমিনবাজারে ওই ছয়জন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ২৭ জুলাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া এলাকায় ডাকাত সাজিয়ে কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও মানুষকে এখনো নাড়া দেয়। পুলিশ গাড়িতে করে এনে জনতার হাতে এই কিশোরকে ছেড়ে দেয়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই মিলনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মব জাস্টিসের নামে যে ঘটনাগুলো হচ্ছে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। কারও ব্যক্তিগত ক্ষোভ চরিতার্থ করার জন্য পিটিয়ে হত্যা কিংবা মব জাস্টিসের নামে হত্যার কোনো সুযোগ নেই। বরং অতীতের অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য ও প্রতিহিংসার চিত্রগুলো কোনোভাবেই পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জায়গায় সোচ্চার থাকা জরুরি। বর্তমান সরকারের তরফ থেকেও বলা হচ্ছে মব জাস্টিসকে সমর্থন করার সুযোগ নেই এবং সরকার সমর্থনও করছে না। তবে প্রশ্নটা দাঁড়িয়েছে, মব জাস্টিসের মাধ্যমে যে ঘটনাগুলো দেখলাম পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সে ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়তো সময় লেগে যাচ্ছে।’ আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে গণপিটুনিতে প্রাণ গেছে ৪৯ জনের। তবে গত বছরে গণপিটুনির ঘটনায় মোট নিহত হয়েছেন ১২৮ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই নিহত ৫৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ জন, খুলনা বিভাগে ১৪ জন, বরিশাল বিভাগে ৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জন, রংপুর বিভাগে ৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ৪ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন।