তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দলের নাম ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’, ইংরেজিতে ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি’, সংক্ষেপে এনসিপি। জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির যৌথ উদ্যোগে গঠিত এই দলের আত্মপ্রকাশ হবে আজ বেলা ৩টায়।
গতকাল জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় নেতারা এসব তথ্য জানান।
সূত্র জানায়, দুটি প্ল্যাটফরমের সমন্বয়ে দেড় শতাধিক সদস্যবিশিষ্ট এনসিপির আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ আট পদে নেতৃত্ব চূড়ান্ত করা হয়েছে। কমিটিতে আহ্বায়ক পদে থাকবেন নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন। প্রধান সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক পদে থাকবেন আবদুল হান্নান মাসউদ। উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হচ্ছেন সারজিস আলম; দক্ষিণাঞ্চলের হাসনাত আবদুল্লাহ। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে সামান্তা শারমিন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব পদে থাকতে পারেন ডা. তাসনিম জারা।
আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতির মাঠে পা রাখতে যাচ্ছেন এই তরুণরা। রাজনীতির মাঠ মানেই ক্ষমতার মাঠ। ভোটের মাঠ। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করে ক্ষমতায় যাওয়ার মাঠ। একটা ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া বিপুল পরিমাণ প্রত্যাশা পূরণের মাঠ। অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে আর মাত্র ১০ মাস পর আগামী ডিসেম্বরে হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা কি পারবেন তাঁদের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের তৈরি হওয়া প্রত্যাশা পূরণের লড়াইয়ে জয়ী হতে? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে। তবে এর আগে মোটাদাগে তরুণদের সামাল দিতে হবে ছয়টি চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জগুলো হলো, একনায়কতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ। দলীয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ। দলের ভিতর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়নে কার্যকর নীতি গ্রহণ। রাজনৈতিক সহিংসতা, দখলদারি ও মাফিয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ। ‘আপনার চোখে নতুন বাংলাদেশ’ শীর্ষক জনমত জরিপ যাচাই কর্মসূচিতে নতুন দলের কাছে এই পাঁচটি প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন দেশের আপামর জনগণ। এই পাঁচ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সম্পূর্ণ নতুন দল হিসেবে আরও একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে হবে তরুণদের। দল গঠন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নতুন দলের পক্ষ থেকে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসছেন তরুণরা। সাংগঠনিক শক্তিমত্তার অংশ হিসেবে এবার তরুণদের প্রতিটি আসনে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী বাছাই করার চ্যালেঞ্জ উতরাতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে, এসব প্রার্থী যেন ভোটারদের কাছে অন্য দলের প্রার্থীদের তুলনায় অধিকতর গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। কেননা ভোটের মাঠ বিবেচনায় দেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি যেকোনো সময় ভোটের জন্য প্রস্তুত। দলটিতে নানা বয়সি ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীর ছড়াছড়ি। ৫ আগস্টের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিএনপির পরের অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি ইতোমধ্যেই দেড় শতাধিক আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করে ভোটের মাঠে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আল মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তরুণদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও উদ্যম আছে, তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলে দেখা গেছে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ, জুলাই প্রক্লেমেশন, সংবিধান স্থগিতকরণসহ নানা ইস্যুতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য প্রয়োজন দলে তরুণ ও প্রবীণের সমন্বয়। অন্যথায় বিপজ্জনক লোকজনের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
হাসান আল মাহমুদ বলেন, দল চালানোর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন নেতা-কর্মীদের কর্মসংস্থান। কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বসংঘাতও সামনের দিনে বাড়বে। এতে তরুণদের যে একটা ইমেজ জাতির সামনে রয়েছে সেটি অন্যান্য গতানুগতিক দলের সমান্তরালে নেমে আসবে। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন তরুণরা। কারণ তাঁদের দলে জিতে আসার মতো পরিচিত ব্যক্তিত্ব একেবারে হাতে গোনা। সে ক্ষেত্রে বিএনপির বিদ্রোহীদের তাঁরা মনোনয়ন দেওয়ার চিন্তা করবেন। তবে সেটা নিজস্ব রাজনীতির জন্য সহায়ক না-ও হতে পারে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে কেবল গণ অভ্যুত্থান হয়েছে। বিপ্লব এখনো অপূর্ণাঙ্গ। গণ অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারীরা যখন ক্ষমতায় যান তখন বিপ্লব পূর্ণাঙ্গ হয়। বিপ্লবীরা তখন গণ অভ্যুত্থানের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ম্যান্ডেট অর্জন করেন। তিনি বলেন, ‘৩৬ জুলাই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে পালাতে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার বিজয় অর্জন হয়ে গেছে এটি ভাবার অবকাশ নেই। জুলাই শহীদরা যেই নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য বন্দুকের নলের সামনে অকাতরে বুক পেতে দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ নির্মাণের মধ্য দিয়েই তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানাতে হবে। নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হবে সেই লড়াইয়ের লক্ষ্যে আমাদের প্রথম ধাপ। শহীদদের রক্ত শোক নয়, শক্তি হয়ে আমাদের সব রকম চ্যালেঞ্জ উতরানোর প্রেরণা জোগাবে।’
আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান : জাতীয় নাগরিক কমিটি সূত্রে জানা যায়, নতুন দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কূটনীতিক, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা, আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রবাসীদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, ধর্মীয় থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ সবার অংশগ্রহণ থাকবে। এর পাশাপাশি গণ অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি করা নানা শ্রেণি-পেশার নির্যাতিত মানুষসহ জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা ছাত্র-জনতা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
এরই মধ্যে জাতীয় নাগরিক কমিটির সারা দেশের চার শতাধিক থানা ও উপজেলার প্রতিনিধি কমিটির সদস্যরা অনুষ্ঠান উপলক্ষে ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে তিন লক্ষাধিক লোকের জনসমাবেশের সামনে আত্মপ্রকাশ ঘটবে নতুন রাজনৈতিক দলের।