জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন নাহিদ ইসলাম। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তিনি পদত্যাগপত্র তুলে দেন। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে সদ্য পদত্যাগ করা উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করেছি, সরকারের চেয়ে রাজপথে ভূমিকা বেশি হবে। বাইরে যে সহযোদ্ধারা রয়েছেন, তারাও একই চিন্তা করেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি আজকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’
গতকাল দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলামের পাশে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রটি ছিল কম্পিউটারে কম্পোজ করা একটি সাদা কাগজ। পদত্যাগপত্রের শুরুতে নাহিদ ইসলাম জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। রক্তক্ষয়ী গণ অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতার ডাকে সাড়া দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব নেওয়ায় প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি। এর পরই উল্লেখ করেন, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ছাত্র-জনতার কাতারে থাকতেই তাঁর এ পদত্যাগ।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। এই সরকারে তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছিলেন নাহিদ ইসলাম। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী সমন্বয়কদের মধ্যে তিনি অন্যতম। সেই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হওয়ার কথা। উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করে নাহিদ ইসলাম সেই দলের নেতৃত্বে আসবেন বলে আলোচনা চলছিল গত কয়েকদিন ধরে। শেষে গতকাল পদত্যাগ করে সাংবাদিকদের সামনে সেই বিষয়টি স্পষ্ট করলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সরকারের বাইরে দেশের যে পরিস্থিতি, সেই পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক শক্তি উত্থানের জন্য আমার রাজপথে থাকা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা করি, সে আকাক্সক্ষার জন্য এবং গণ অভ্যুত্থানে যেসব ছাত্র-জনতা অংশগ্রহণ করেছে সেই শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করছি, সরকারের থেকে সরকারের বাইরে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে। বাইরে যে আমাদের সহযোগী যোদ্ধা রয়েছেন তারাও এটি চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজকে মূলত পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’
সদ্য পদত্যাগী এই উপদেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারে তাঁর যোগ দেওয়ার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে বলেন, গণ অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা তিনজন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিই। তখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গণ অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করা আমাদের কাছে মনে হয়েছিল যৌক্তিক। তবে গত ছয় মাসে আমাদের গণ অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা হয়তো বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে সরকারে একটা স্ট্যাবিলিটি এসেছে। তিনি বলেন, ‘বিচার এবং সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এ সরকার গঠিত হয়েছিল, ছাত্ররা এসেছিল, সে প্রতিশ্রুতি পূরণে অন্য যে দুজন (ছাত্র উপদেষ্টা) রয়েছেন, তারা মনে করছেন তাদের এখনো সরকারে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তারা রাজনীতির প্রয়োজন মনে করলে তখন হয়তো সরকার ছেড়ে দেবেন।’
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা আছে কি না- এমন প্রশ্নে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। সেই সীমাবদ্ধতা কাটানোর চেষ্টা করেছি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল। আমরা এসে পুলিশকে পেয়েছি তাদের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সময় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তাঁর মা-বাবা, স্ত্রী এবং ছোট ভাই উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, যা এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। নাহিদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবিও তোলেন প্রধান উপদেষ্টা। এর আগে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গেও ছবি তোলেন তিনি। সন্ধ্যায় পদত্যাগপত্র নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে শেয়ার করে নাহিদ ইসলাম লেখেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ, যোদ্ধা ও আপামর জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে আগস্টে সরকারে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন শুধু সরকারের ভিতরে থেকে পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই আজ আমি সরকার থেকে বিদায় নিচ্ছি- একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লড়াই শেষ হয়নি, এটি শুধু নতুন রূপে শুরু হচ্ছে।’
জমকালো আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তরুণরা : জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করছেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা। আগামী শুক্রবার সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেবেন তারা। আত্মপ্রকাশকে ঘিরে তিন লক্ষাধিক মানুষের গণজমায়েতের টার্গেট নিয়েছেন তরুণরা। অনুষ্ঠান আয়োজনের সার্বিক পরিকল্পনা করতে গতকাল জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়। জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক, কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন উপকমিটির প্রধান আরিফুল ইসলাম আদীব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের জনগণ নতুনদের দিকে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের সূচনা করতে চাই আমরা। রাজনৈতিক শক্তিমত্তার জানান দিতে আমাদের পক্ষ থেকে সব রকম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নাগরিক কমিটির সহমুখপাত্র এবং মিডিয়া সেল প্রধান মুশফিক উস সালেহীন বলেন, সারা দেশে নাগরিক কমিটির চার শতাধিক প্রতিনিধি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা সবাই আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। তাদের ঢাকায় আসার জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।