অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি এনে দিতে আমাদের অনেক আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। মাতৃভাষার জন্য জীবনদানের এমন ঘটনা পৃথিবীতে নজিরবিহীন। এ আন্দোলন মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য সূচিত হলেও এর মূল চেতনাটি ছিল স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এটা ছিল বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলন। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি তাই শুধু বেদনার্ত অতীত স্মরণ করে অশ্রু বিসর্জনের দিন নয়, বরং এক অবিনাশী প্রেরণা, সব ধরনের অন্যায়, অবিচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বীজমন্ত্র।
গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী আয়োজনে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে লিঙ্গুইস্টিক অলিম্পিয়াড বিজয়ীদের সনদপত্র প্রদান এবং ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা আন্তর্জাতিক পদক’ প্রদান করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মাতৃভাষা যে কোনো নৃ-গোষ্ঠীর ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বাহক। জাতিধর্মনির্বিশেষে সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মাতৃভাষার চেতনা ও মর্যাদা রক্ষার প্রেরণা ও এ চেতনার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকতার সূত্রে ২০০১ সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। জাতির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের ভিত রচিত হয়।
তিনি বলেন, একটি নতুন ভাষা শিখলেই পুরোনো ভাষায় দুর্বল হয়ে পড়বে এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। পৃথিবীর বহু দেশে একই নাগরিক সাবলীলভাবে কয়েকটি ভাষায় কথা বলবেন, এটা খুবই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। তারা শৈশব থেকে নানা ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। স্কুলে পড়ার সময় প্রত্যেক ছাত্রকে অন্তত একটি ভিন্ন ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়। নিত্যনতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা দ্রুতগতিতে নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করে যাচ্ছি। প্রযুক্তির প্রাধান্যের সঙ্গে আসে ভাষার প্রাধান্য। যে দেশের প্রযুক্তি পৃথিবীতে প্রাধান্য অর্জন করবে, সারা পৃথিবী সেই ভাষা শেখার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। স্পুটনিক যখন মহাকাশে উড়ল, সারা পৃথিবী রাশিয়ান ভাষা শেখার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। যেই মাত্র চীন প্রযুক্তিতে এগিয়ে এলো, চীনা ভাষা শেখার ধুম লেগে গেল। যে দেশ পৃথিবীতে নেতৃত্ব দেবে, মানুষ সে দেশের ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়বে-এটাই নিয়ম। জাতি এগোলে ভাষা এগোয়। ভাষার সম্মান বাড়ে। নিজ ভাষার নিবেদিতপ্রাণ প্রচারকর্মী হওয়া সত্ত্বেও জাতির কাছ থেকে পৃথিবীর ভান্ডারে কিছু দেওয়ার না থাকলে ভাষার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। তাই ভাষার গুরুত্ব বাড়াতে জাতিকে যে কোনো দিক দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, আজ আমরা মাতৃভাষা দিবসে সব মাতৃভাষা সংরক্ষণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম। আবেগের কারণ তো আছেই, মস্তবড় স্বার্থের কারণও আছে। এখন আমাদের জানা নেই কোন অজ্ঞাত নামহীন মাতৃভাষা পৃথিবী বদলে দেবে। কোন সম্ভাবনাকে অবজ্ঞা করা হবে মস্তবড় ভুল!