ইংরেজির দাপট ও প্রচলনের জন্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা এখন উপেক্ষিত। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, আদালত, প্রচার-সম্প্রচার মাধ্যম থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলার ব্যবহার এখনো অবহেলিত। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- বাংলা ভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেলেও এর প্রচার ও প্রসার এখনো পিছিয়ে আছে। তরুণ প্রজন্ম এখন ইংরেজি-বাংলার মিশ্রণে অদ্ভুত এক ভাষা ব্যবহার করছে। এ অবস্থায় বাংলা ভাষার প্রসারে এবং এর বিকৃতি ঠেকাতে বিশেষজ্ঞরা উচ্চশিক্ষা, আদালত এবং দাপ্তরিক কাজে বাংলাকে প্রধান মাধ্যম করার জন্য অবিলম্বে একাধিক কমিটি গঠন করে উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন।
১৯৮৭ সালের ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন এর ৩ (১) ধারা অনুযায়ী দেশের সব সরকারি অফিস-আদালত, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জওয়াব এবং অন্যান্য কার্যাবলির নথিপত্র অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। আইন অনুযায়ী, কর্মস্থলে কেউ বাংলার পরিবর্তে অন্য ভাষা ব্যবহার করলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এ আইন লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন, কোথাও আইনটি মানা হচ্ছে না। এর কোনো জবাবদিহিও নেই। আদালতেও বাংলা ভাষা ব্যবহার কম হচ্ছে। উচ্চ আদালতে খুব কম সংখ্যক বিচারক বাংলায় রায় ও আদেশ দেন। উচ্চ আদালতের এক আদেশে বিদেশি দূতাবাস ও প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে সব স্থানে সাইনবোর্ড, নামফলক, বিজ্ঞাপনী বোর্ড ও টেলিভিশনে প্রচারিত বিজ্ঞাপন বাংলায় হতে হবে বলে জানালেও এমনটি মানা হচ্ছে না।
এমনকি উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা একেবারেই উপেক্ষিত। ¯œাতক পর্যায়ে অনেক অনুষদে প্রায় সব কোর্সে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয়। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সব ধরনের শিক্ষায় মাতৃভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ছাড়া শিক্ষা প্রদান হয় না।
আধুনিক সময়ে এসে ভাব আদানপ্রদানে ব্যবহৃত ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইংরেজির তুলনায় বাংলার ব্যবহার তুলনামূলক কম। ফেসবুকে যারা বাংলা লেখেন তাদের বড় অংশই ভুল বানানে বাংলা লেখেন। বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের নাটক এবং এফএম রেডিওতে এখন বিকৃতভাবে বাংলা ভাষা উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দির সংমিশ্রণে তৈরি নতুন এক ধরনের ভাষা ব্যবহার করার প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। আবার বিপণিবিতানের সাইনবোর্ডেও ইংরেজির দাপট। এখন অশুদ্ধ বাংলা ভাষায় বের হচ্ছে গল্প, কবিতা ও উপন্যাসের বই। বাংলাকে সর্বস্তরে চালু করতে হলে রাষ্ট্রের একটি সুনির্দিষ্ট ভাষানীতি থাকা প্রয়োজন। যে ভাষানীতি অনুসরণের জন্য সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। কিন্তু দেশে এমন কোনো ভাষানীতিও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত হাজার বছরের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, বাংলা ভাষা কখনো শাসকের অনুগ্রহ লাভ করেনি। তার পরও বাংলা ভাষায় বিপুল পরিমাণে সাহিত্যচর্চা হয়েছে এবং পৃথিবীর একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী এ ভাষায় কথা বলে। বাংলা ভাষার অধিকারের কথা যখন বলা হয়, তখন আসলে দুটি অধিকারের কথা বলা হয়- মর্যাদা পরিকল্পনা এবং কাঠামোগত পরিকল্পনা। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থাৎ ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সর্বস্তরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ঘাটতি দেখা যায়। এ অধ্যাপক আরও বলেন, ভাষার প্রমিত রূপের ব্যবহার নিয়েও কথা আছে। লিখিত ভাষায় প্রমিত রূপ দিয়েই শিশু লেখা শুরু করে। তার প্রতিফলন শিক্ষা ক্ষেত্রে দেখা যায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রজন্ম নতুন ভাষা তৈরি করে নিয়েছে। দেশের অর্থনীতি আর রাজনীতির সঙ্গে ভাষানীতি তৈরি না হলে, বাংলা ভাষার ক্ষয় কিন্তু ঘটতেই থাকবে। আর বলার ক্ষেত্রে প্রমিত ব্যবহারে উৎসাহিত করা হলেও তার জন্য শিক্ষা পরিকল্পনায় কোনো উদ্যোগ নেই।