বন্দিজীবন কষ্টের জীবন। আমরা মূলত সবাই বন্দি। অফিসে, ব্যবসাবাণিজ্যে, চাকরিতে থাকাবস্থায় যখন ইচ্ছা তখন কিছু করতে পারি না। প্রবাসজীবনেও বন্দি হয়ে থাকতে হয় প্রবাসীদের। মা-বাবার ভালোবাসা রেখে, স্ত্রী- সন্তানদের দূরে রেখে জন্মভূমির মায়া ছেড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বুকে পাথর বাঁধতে হয়, যা একমাত্র প্রবাসী ভাইয়েরা বোঝে। আসলেই দুনিয়াটা কিন্তু এক ধরনের জেলখানা। যা আমরা মুসলিম শরিফের হাদিসে দেখতে পাই। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফেরের জন্য জান্নাত’।
ঈদ আনন্দ সবারই জন্য। ধনী-গরিব ছোটবড় সব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে ঈদ উদযাপন করবে এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঈদের নামাজ ও পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে ঈদ উদযাপনের মজাই আলাদা। ঈদের দিন মা-বাবাকে কদমবুসি করা সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে ঈদ সেলামি দেওয়ার আনন্দটাই আলাদা। আবার মা-বাবাভক্ত পাগল ছেলেটা মা-বাবা হারিয়ে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের অশ্রুতে দোয়া করে- ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’
কারাগারে যাদের অবস্থান তাদেরও ঈদ আনন্দ রয়েছে। ঈদের দিন তাদের উল্লাসে মাতিয়ে মনকে ভালো রাখার জন্য পুরো দিন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল কারা কর্তৃপক্ষ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সকাল ৮টায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজের মাধ্যমে শুরু হয় বন্দিদের ঈদ আনন্দ। কারাগারের বাইরে যেভাবে সবাই মিলে কাঁধে কাঁধ রেখে ঈদের নামাজ আদায় করে, ঠিক সেভাবেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জে প্রায় ৮ হাজার বন্দি সম্মিলিতভাবে কাঁধে কাঁধ রেখে নামাজ আদায় ও মোনাজাতের মাধ্যমে শুরু করে এবারের ঈদুল ফিতর-২৫ এর ঈদ আনন্দ।
ঈদের আনন্দে মিষ্টিমুখ হবে না তা কীভাবে হয়। তাই বন্দিদের সেমাই মিষ্টান্ন খাবারের সুব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় কারাগার। ঈদের দিন দুপুরে প্রত্যেককেই ভালো খাবার পরিবেশন করা হয়। খুশির এ দিনে ভালো খাবার পরিবেশনের জন্য দুপুরে গরু/খাসির গোস্ত, মুরগির রোস্ট, পোলাও ভাত, কোমলপানীয়, পান-সুপারি এবং মিষ্টির ব্যবস্থা করেছিল কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। যার মাধ্যমে কারাবন্দিদের ঈদের আনন্দের পূর্ণতা ও ঈদের আমেজ তৈরি হয় এবং নিজেদের মধ্যে ঈদুল ফিতরের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারে।
ঈদের দিন বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল কারাগারে সাক্ষাৎ করতে আসা বন্দির আত্মীয়স্বজনদের ফুল দিয়ে বরণ ও মিষ্টি দেওয়াসহ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মোবাইল ফোনে ঈদের কুশল বিনিময় করার বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, যাতে কেরানীগঞ্জ কারাগারের বন্দি ও তাদের আত্মীয়স্বজন খুশিতে পুলকিত হয়। ঈদের দ্বিতীয় দিনে বন্দিরা বাসায় রান্না করা খাবার হাতে পেয়ে তাদের ঈদ আনন্দ আরও বহুগুণে বেড়ে যায়।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনের নির্দেশনায় কারা উপমহাপরিদর্শকদের তত্ত্বাবধানে প্রত্যেক কারাগারে কারা তত্ত্বাবধায়ক ও জেলারগণ কারাগারে উপস্থিত থেকে কারা বন্দিদের ঈদের এ আনন্দঘন মুহূর্তে তাদের কষ্ট দূর করতে ও মন ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে তারা নতুন করে জীবন শুরু করার অনুপ্রেরণা পায় সেই ধরনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। কারাবন্দিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জাগ্রত করতে এবং আলোকিত পথের পথিক হওয়ার উপায় অন্বেষণের জন্য আলোচনা সভা, মতবিনিময় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কারা কর্তৃপক্ষ। কারাগারের কর্মকর্তা/কর্মচারীরা বন্দিদের মুখে ঈদের খুশি তৈরিতে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানান। ঈদের আনন্দ সবার জন্য। কারা প্রশাসনের এ উদ্যোগে বন্দিদের মাঝে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ ধরনের কাজ বন্দিদের মনে আনন্দ ও আশার আলো জাগ্রত করে সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করবে। পরিবারের সদস্যদের (বন্দির) উচিত বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে এসে পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কথা না বলে ধৈর্যের বাণী শোনানো, এমন কথা বলা যাতে বন্দিজীবনে অন্তরাত্মাকে পবিত্র করতে পারে এবং সত্যিকারের একজন সোনার মানুষে পরিণত হতে পারে। বন্দিরা ভালো থাকুক, মহান আল্লাহর ওলি হোক, আলোর পথের পথিক হতে পারে সেই প্রার্থনা মহান রবের দরবারে।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক