ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে একাত্তরের স্বাধীনতা। মাতৃভাষার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের দায়বদ্ধতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগই থাকা উচিত নয়। তারপরও বাংলা ভাষার প্রতি অঙ্গীকার পূরণে আমরা কতটা আন্তরিক, তা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। ইংরেজির দাপটে প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা এখন উপেক্ষিত। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, আদালত ও উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলার ব্যবহার উপেক্ষিত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম ইংরেজি-বাংলার মিশ্রণে অদ্ভুত এক ভাষা ব্যবহার করছে। এ অবস্থায় বাংলা ভাষার প্রসার এবং এর বিকৃতি রোধে উচ্চশিক্ষা, আদালত এবং দাপ্তরিক কাজে বাংলাকে প্রধান মাধ্যম করার জন্য অবিলম্বে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব হচ্ছে। ১৯৮৭ সালের ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ৩(১) ধারা অনুযায়ী বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সরকারি অফিস-আদালত, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়ালজওয়াব, নথিপত্র বাংলায় লেখার বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী কর্মস্থলে কেউ বাংলার পরিবর্তে অন্য ভাষা ব্যবহার করলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে বিবেচিত হওয়ার কথা। অথচ মাতৃভাষা বাংলা এবং দেশের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোথাও তা মানা হচ্ছে না। এ বিষয়ে কোথাও জবাবদিহি নেই। আদালতেও বাংলা ভাষা ব্যবহার কম হচ্ছে। উচ্চ আদালতে খুব কমসংখ্যক বিচারক বাংলায় রায় ও আদেশ দেন। উচ্চ আদালতের এক আদেশে বিদেশি দূতাবাস ও প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে সাইনবোর্ড, নামফলক, বিজ্ঞাপনী বোর্ড ও টেলিভিশনে প্রচারিত বিজ্ঞাপন বাংলায় করার নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এমনকি উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা একেবারেই উপেক্ষিত। স্নাতক পর্যায়ে অনেক অনুষদে প্রায় সব কোর্সে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয়। বেসরকারি বিশবিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমেই শিক্ষা দেওয়া হয়। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো দায় আছে বলে মনে হয় না। বৈশ্বিক প্রয়োজনে ইংরেজি বা অন্য ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে নিজেদের ভাষাকে উপেক্ষা করার আত্মঘাতী প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।