নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের অবসান চেয়ে সুপারিশমালা তৈরি করছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন। চলতি মাসের শেষে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দেবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক। মূলত কমিশনের সুপারিশে বাল্যবিবাহ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইনে সংস্কার আনার সুপারিশ করা হয়েছে। বেশ কিছু আইন আছে যেগুলো ব্রিটিশ আমলে করা হয়েছে। এগুলো সংস্কার করে যুগোপযোগী করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সাংবিধানিক কিছু ধারাও কমিশন সংস্কার করতে বলেছে। আবার কিছু নতুন আইন করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পুরোনো আইনগুলো বাতিল করার সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের যে আইন আছে সেগুলোও সংস্কার করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমিশনের সুপারিশগুলো মোট তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর একটি হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে সুপারিশগুলো অর্জন করা সম্ভব। এরপর দেশে যে নির্বাচিত সরকার আসবে তাদের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যা পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য ধরা হয়েছে। আরেকটি ধাপে সামগ্রিকভাবে নারী আন্দোলনের যে আকাঙ্ক্ষার জায়গা সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশমালা তুলে ধরেছে কমিশন। মূলত নারীর উত্তরাধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে সমান অধিকার পাওয়ার জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন তৈরি এবং সংবিধানে এ বৈষম্য দূর করার সুপারিশ তুলে ধরছে কমিশন। এ ছাড়া সম্পদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে নারীকে সমান অধিকার দেওয়া, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধানের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের নিচে) মেয়েদের বিবাহের সুযোগ বন্ধ করা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার মতো সুপারিশও থাকছে।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির শেষে আমাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও আমরা তৈরি করতে পারিনি। চলতি মার্চের ৩১ তারিখ পর্যন্ত আমরা সময় বাড়িয়েছি। আমরা বেশ কিছু বিষয় এ সুপারিশমালায় যুক্ত করছি। যে কমিশনগুলো হচ্ছে সেগুলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফসল। এজন্য আমাদের মূল নজরই হবে নারীর বৈষম্যের অবসান করা। আর এ বৈষম্য আইনে হোক, নীতিতে হোক, কর্মসূচিতে হোক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হোক বৈষম্য চিহ্নিত করে সুপারিশগুলো করা হবে। বৈষম্যের আমরা বিলুপ্তি চাই।’
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের আরেক সদস্য অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে অভিজ্ঞতার আলোকে যে আইনগুলো মনে হয়েছে বৈষম্যমূলক বা যে আইনগুলো সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, যে আইন নিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছি সে আইনগুলো বাতিল বা সংস্কার করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু আইন আছে খুব পুরোনো। আধুনিক যুগে এসেও আমরা বলছি না যে, এ পুরোনো আইনগুলো বাতিল করতে হবে। যুগোপযোগী আইনের মাধ্যমে পুরোনো আইনে সংস্কার আনতে হবে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের যে আইন আছে সেগুলোর সংস্কার হয়নি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে খ্রিস্টান ও হিন্দু আইন চলে আসছে। এগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি। এভিডেন্স অ্যাক্টগুলোতে কিছু সংস্কার এসেছে, কিছু আসেনি। বেশ কিছু আইন আছে যেখানে ব্রিটিশ আমলের আইনগুলোর ওপরই আমরা ঝুঁকে আছি। বাস্তবমুখী এবং যুগোপযোগী আইন তৈরির জন্য আমরা সুপারিশ করেছি। এ ছাড়া আমাদের আইন-আদালত যেভাবে চলছে একে “রেজাল্ট ওরিয়েনটেড” করার সুপারিশ করেছি। আদালতে যারা যাচ্ছেন তারা যাতে সেবা পেতে পারেন সে বিষয়ে আমরা বলেছি। নারীর প্রতি যে বৈষম্য হচ্ছে তা থেকে যেন আমরা বেরিয়ে আসতে পারি।’
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠনের আগে গত বছরের ২০ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছিল নারী সংগঠনগুলো। সে সময় নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হক আলোচনায় নেতৃত্ব দেন। গত বছরের ১৮ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১০ সদস্যের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠনসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। শিরীন পারভীন হককে প্রধান করে গঠিত কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাহীন সুলতান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফৌজিয়া করিম ফিরোজ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার, নারীস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হালিদা হানুম আখতার, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান, নারীপক্ষের পরিচালক কামরুন নাহার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা ফেরদৌসী সুলতানা ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিশিতা জামান নিহা।