গণ অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২০ জনের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত ১৮টি মামলা (মিস কেস) হয়েছে। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৯ জনকে। এ মামলাগুলোর তদন্তে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে ভিডিও, অডিও, ছবির মতো ডিজিটাল এভিডেন্স।
প্রসিকিউশন বলছে, হাজার হাজার ভিডিও-অডিও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এরই মধ্যে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা অনেক ডিজিটাল এভিডেন্স সংগ্রহ করেছে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, এ মামলাগুলো এখন বিচারের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল তা গ্রহণ করলে এসব মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হবে। গণ অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় আড়াই মাস পর ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর একাত্তরের পাশাপাশি ২০২৪ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের একাধিক সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধিত আইনে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত এভিডেন্স হিসেবে গ্রহণের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনে রাখা হয়েছে গুমের অভিযোগের বিচারের সুযোগও।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় সূত্র বলছে, গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা ও গণহত্যা এবং আওয়ামী লীগের বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এ পর্যন্ত ৪০০টির মতো অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ট্রাইব্যুনালে ১৮টি মামলার (মিস কেস) মধ্যে ৩টি মামলা হয়েছে গুমের ঘটনায়। বাকি ১৫টি মামলা হয়েছে গণ অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায়। ১৮ মামলার মধ্যে দুটিতে আসামি করা হয়েছে শেখ হাসিনাকে। একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। আরেকটি মামলা হয়েছে গুমের ঘটনায়। বেশ কয়েকবার সময় নিয়েও এখনো কোনো মামলায়ই তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তদন্তের ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় সামনে রেখে আমরা এগোচ্ছি। এর মধ্যে প্রথমত ভিকটিম। তিনিই লাইভ সাক্ষী দেবেন তার সঙ্গে কী ঘটেছে। এর সঙ্গে ডেথ সার্টিফিকেট, ইনজুরি সার্টিফিকেটসহ মেডিকেল ডকুমেন্ট আসবে। এরপর আসবে পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত। তিনি বলেন, এখানেই প্রচুর পরিমাণে ডিজিটাল এভিডেন্স রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, অডিও রেকর্ড, কল রেকর্ড, কললিস্ট ইত্যাদি। আইনে এ ডিজিটাল এভিডেন্সের অনেকগুলো টার্ম রয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু এ জেনারেশন তথ্যপ্রযুক্তির জেনারেশন। তাই এবারের মামলায় বড় অংশজুড়ে থাকবে ডিজিটাল এভিডেন্স।
একাত্তরের ঘটনার বিচার ও ’২৪-এর ঘটনার বিচারের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, পার্থক্য অনেক। একাত্তরের ঘটনার বিচার হয়েছে অনেক বছর পর। দেখা সাক্ষী ছিল না। সব শোনা সাক্ষী। এবারের সব ঘটনার হাজার হাজার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। কারোই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ডিজিটাল এভিডেন্সের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষা করেই প্রাপ্ত এভিডেন্স যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।