অপারেশন ডেভিল হান্ট চলাকালীন ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। কায়েতপাড়া বাঁওড়ের দখল নিয়েই শনিবার গভীর রাতে হরিণাকুণ্ডের নারায়ণকান্দি গ্রামের মাঠে নতুনভাবে চারটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ট্রিপল মার্ডারের পরেই শনিবার রাতে নতুনভাবে বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দে এলাকায় উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে কে বা কারা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে সে সম্পর্কে পুলিশ কিছুই জানে না বলে জানিয়েছে। এদিকে এ তিনজনকে হত্যাকাণ্ডে বিবৃতিতে জানিয়েছে, জাসদ গণবাহিনী নামে তাদের কোনো সংগঠন নেই। শনিবার রাতে জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের পাঠানো বিবৃতিতে এমনটি জানানো হয়েছে। বিবৃতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সাংগঠনিক সম্পাদক অসিত সিংহ রায়। তিনি তার ফেসবুক আইডিতে বিবৃতিটি পোস্ট করেন। এদিকে জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির দেওয়া বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝিনাইদহে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় কয়েকটি মিডিয়ায় জাসদ গণবাহিনী নাম উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরির সম্ভাবনা আছে। জাসদের বিবৃতিতে বলা হয়, জাসদ গণবাহিনী নামের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠন নেই। জাসদ রাজনৈতিক, আদর্শিক, সাংগঠনিকভাবে চরমপন্থি কোনো সংগঠন নয়। সশস্ত্র তৎপরতা ও সশস্ত্র সংগঠনকে সমর্থন দেয় না। জাসদের বিবৃতিতে কোনো ধরনের চরমপন্থি বা সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে জাসদের নাম যুক্ত না করতে মিডিয়া এবং সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ করেছেন।
পুলিশ সূত্র থেকে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কায়েতপাড়া বাঁওড়ের দখলকে কেন্দ্র করে এই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। নিহত চরমপন্থি নেতা হানিফ মৃত্যুদমামলায় তার ফাঁসির আদেশ হয়। উচ্চ আদালতেও ফাঁসির রায় বহাল থাকলে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের বিশেষ ক্ষমার সুযোগে এলাকায় ফিরে আসেন এবং মৎস্যজীবী লীগের হরিণাকুকরে এলাকায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। হাসিনা সরকারের পতন হলে দুর্ধর্ষ হানিফ অন্য একটি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় আবারও ফিরে আসার চেষ্টা করেন। সূত্রটি আরও জানায়, শুক্রবার রাতের ট্রিপল মার্ডারের নেপথ্যে রয়েছে আলমডাঙ্গার কায়েতপাড়া বাঁওড়। ওই বাঁওড়ে বছরে কোটি টাকার ওপরে মাছ চাষ হয়। মৎস্যজীবী লীগ নেতা ও পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধ এমএলের আঞ্চলিক প্রধান হানিফ মণ্ডল বাঁওড়ে মাছ ধরা ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। যা নিয়ে এলাকায় বিবদমান একাধিক অহুারওয়ার্ল্ড গ্রুপের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। সেই সূত্র ধরেই হানিফ, তার শ্যালক লিটন ও দেহরক্ষী রাইছুলকে হত্যা করা হয়। এই কায়েতপাড়া বাঁওড় নিয়ে গত ৩০ বছরে প্রায় অর্ধশত মানুষ খুনের ঘটনা ঘটেছে। হরিণাকু ুর সাধারণ মানুষের ভাষ্যমতে, চরমপন্থি হানিফের বিরুদ্ধে হরিণাকু ও পোলতাডাঙ্গার ইজাল মাস্টারসহ শতাধিক মানুষকে গুলি ও গলা কেটে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ট্রিপল মার্ডারের পরে শনিবার গভীর রাতে হরিণাকু ুর তাহেরহুদা ইউনিয়নের নারায়ণকান্দি গ্রামে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য নতুনভাবে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। হরিণাকু ু উপজেলার নারায়ণকান্দি, পোলতাডাঙ্গা, কায়েতপাড়া এবং চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ফতেপুর, শ্রীনগর ও রামদিয়া এই চয় গ্রামের ওপর কায়েতপাড়া বাঁওড়টি অবস্থিত। বাঁওড়ে তালিকাভুক্ত মৎস্যজীবীরা মাছ চাষ করে থাকেন। স্বাধীনতার পর থেকে বাঁওড়টি চরমপন্থিরা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এক সময় বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি হক গ্রুপের আঞ্চলিক নেতা ক্রসফায়ারে নিহত মফিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের নেতা হানিফের হাতে। এলাকাবাসীদের ধারণা, বাঁওড় কেন্দ্রিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে হানিফসহ ট্রিপল মার্ডার সংঘটিত হয়েছে। শৈলকুপার সহকারী পুলিশ সুপার অমিত কুমার বর্মণ জানিয়েছেন, হত্যায় জড়িত কাউকে আটক করা যায়নি। এমনকি মামলাও হয়নি। তবে প্রকৃত হত্যাকারীদের আটক করতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার ইবি থানা এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। উল্লেখ্য, চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এমএল জনযুদ্ধ লাল পতাকার আঞ্চলিক প্রধান ও মৎস্যজীবী লীগ নেতা হানিফ উদ্দিন ওরফে হানেফ মণ্ডল, তার শ্যালক লিটন মিয়া ও হানিফের দেহরক্ষী রাইসুল ইসলাম শুক্রবার রাতে শৈলকুপা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের ত্রিবেনী শ্মশান খাল এলাকায় খুন হয়েছেন। পরে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠন জাসদ গণবাহিনীর কালু গ্রুপের প্রধান কমরেড কালু হোয়াটসঅ্যাপে সাংবাদিকদের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেন।