বিচারাঙ্গনে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ ও হয়রানির চিত্র উঠে এসেছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। কমিশন বলছে, আদালত, আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীদের আচরণ নিয়ে সেবা নিতে আসা জনগণের অভিজ্ঞতা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ নয়। সংস্কার কমিশন পরিচালিত অনলাইন জরিপে মতামত দেওয়া ৮০ দশমিক ১০ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন আইনজীবীরা অযথা সময় নষ্ট করেন। আর আদালতের কর্মচারীরা হয়রানি করেন মর্মে মতামত দিয়েছেন ৯০ দশমিক ৯০ শতাংশ নাগরিক। অন্যদিকে জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫ দশমিক ৯০ শতাংশ আইনজীবীর মতে, আদালতের কার্যক্রম হয়রানিমূলক।
কমিশনের প্রতিবেদনে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি লাঘবে ১৬ দফা সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের কাছে এ প্রতিবেদন তুলে দেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আট সদস্যের কমিশন। ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ৩১টি অধ্যায়ে বিচার বিভাগ সংস্কার নিয়ে নানা সুপারিশ ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কখনো বিচারব্যবস্থার পদ্ধতিগত কারণে, কখনো আদালতের অব্যবস্থাপনার জন্য, আবার কখনো আইনজীবী বা আইনজীবী সমিতির দ্বারা বিচারপ্রার্থীরা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নাগরিকদের বেশির ভাগই বিচারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কারও সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট নন। সংস্কার কমিশন পরিচালিত অনলাইন জরিপে মতামত প্রদানকারী নাগরিক, আইনজীবী, সহায়ক কর্মচারী, বিচারক ও আইনজীবীদের ৮০ শতাংশের বেশি হয়রানিমুক্ত বিচারব্যবস্থা চান মর্মে মতামত দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচারকের ছুটিজনিত কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় বিচারপ্রার্থীদের। পাশাপাশি বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন, তদন্তাধীন ফৌজদারি মামলায় প্রকাশ্য আদালতে তারিখ না দেওয়া, আইনজীবীর মৃত্যুতে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকা, বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত লিফট না থাকা, মাতৃদুগ্ধদানকারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকার কারণেও দুর্ভোগে পড়েন বিচারপ্রার্থীরা।
বিচারাঙ্গন থেকে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ ও হয়রানি লাঘবে কমিশনের দেওয়া সুপারিশে বলা হয়েছে, আদালত প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিচার বিভাগে বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন বা অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি আয়োজন বন্ধ করতে হবে। ক্ষেত্র সীমিত করার জন্য সার্কুলার জারি করতে হবে। বিচারক ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই ওয়েবসাইট বা অনলাইন প্ল্যাটফরমে প্রকাশ করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তাধীন ফৌজদারি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বৃদ্ধি সংক্রান্ত দরখাস্তের ক্ষেত্রে বাদীর উপস্থিতিতে শুনানির মাধ্যমে আদেশ প্রদান করতে হবে। সুপারিশে আরও বলা হয়, মামলার তারিখ ও প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি জানার ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি ও দুর্ভোগ কমানোর জন্য অনলাইন ভিত্তিক ই-কজলিস্ট চালু করতে হবে। আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মামলার বাদী-বিবাদীর জাতীয় পরিচয়পত্র যাতে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই বা শনাক্ত করা যায়, এজন্য নির্বাচন কমিশনের গেটওয়ে সার্ভারে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। সুপারিশে আরও বলা হয়, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে উন্মুক্ত চত্বরে দিনের বেলায় মাদক পোড়ানো বন্ধ করে বিকল্প স্থান নির্ধারণ করতে হবে। আদালতের আদেশের মাধ্যমে দেওয়া খরচ বা জরিমানার টাকা আইনজীবীর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে গ্রহণের কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করে সার্কুলার জারি করতে হবে। পাশাপাশি মামলার আদেশ, রায়, ডিক্রিসহ অন্যান্য কাগজপত্রের জাবেদা নকল প্রদানের ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধের লক্ষ্যে সরবরাহ পদ্ধতি সহজ করে সার্কুলার জারি করতে হবে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, আদালত প্রাঙ্গণে শিশুদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং কক্ষ স্থাপন করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের চলাফেরার সুবিধার্থে লিফট ও আদালতে অনুকূল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বহুতল বিশিষ্ট আদালত ভবনসমূহে পর্যাপ্ত লিফট এবং লিফটম্যানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে জেলা পর্যায়ে আদালত বর্জন কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট এবং বার কাউন্সিলের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে বার কাউন্সিলকে সার্কুলার জারি করতে হবে। আইনজীবীদের ব্যক্তিগত মামলায় বিপক্ষের হয়ে বারের কোনো সদস্য মামলা পরিচালনা করতে পারবে না মর্মে অলিখিত প্রচলন যেখানে রয়েছে, সেখানে বার কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনজীবীদের অসদাচরণ সংক্রান্ত বিষয়ে আনা অভিযোগের তদন্ত, শুনানি ও নিষ্পত্তির বিষয়ে জেলা পর্যায়ে একটি প্রতিকার ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন বলে সংস্কার কমিশনের সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।