জুলাইয়ের চেয়ে আগস্টে সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে তিন গুণ। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, আগস্টে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসীদের ওপরও হামলা হয়েছে। গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা পর্যালোচনা শেষে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হামলা, আহত, হুমকি, হয়রানি ও আইনি হয়রানির ঘটনা জুলাইয়ে ছিল ৩০টি। আগস্টে তা বেড়ে ৯৬টি হয়েছে। তবে আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতা কিছুটা কমেছে বলে এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এমএসএফ বলছে, ‘দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আগস্টে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতি উন্মোচন ও সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের হত্যা, হত্যার পরিকল্পনা, প্রাণনাশের হুমকি, হামলায় আহত, ভয়ভীতির পাশাপাশি মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সত্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে পদে পদে বাধা পেয়েছেন এবং চরম বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন সাংবাদিকরা। সংবিধান প্রদত্ত সাংবাদিকদের অধিকার প্রয়োগের পথ রুদ্ধ করার মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে।
এগুলো দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।’
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে হুমকি ও হামলা তথা সাংবাদিকতা এবং মত প্রকাশের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার প্রয়োগের পথ রুদ্ধ করার ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, ফেনীতে পাঁচজন সাংবাদিককে হামলা ও হত্যার পরিকল্পনা, হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে দুজন সাংবাদিককে। ১১ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত এবং নানাভাবে ৪৫ জন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এ মাসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে যোগ করে এমএসএফ। এতে বলা হয়, ‘৩৩ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুজনকে।’
এমএসএফ বলছে, ‘চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশে স্বাধীনতায় বিশ্বাসীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মঞ্চ ৭১ নামের একটি সংগঠনের গোলটেবিল বৈঠক প করে দেওয়া হয়। এরপর পুলিশ হেফাজতে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ ১৪ জনকে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না হলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাবে।’
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ‘আগস্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানকালে গোলাগুলিতে একজন ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত হয়েছেন। অপরদিকে অভিযানকালে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন গুলিবিদ্ধ এবং অপরজনকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ পরিচয়ে একজন অপহণের ঘটনা ঘটেছে। থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় একজন আত্মহত্যা এবং একজন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়া, পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় আদালত প্রাঙ্গণে একজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। পুলিশি নির্যাতনে একজনের মৃত্যু, দুজন আহত ও গ্রেপ্তারের ভয়ে পালাতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।’
এ মাসে সমাবেশ ছাড়া রাজনেতিক কর্মকাণ্ড না থাকলেও নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বকালীন সহিংসতায় হতাহত ও দুষ্কৃতকারীদের হাতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নিহত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এতে বলা হয়, ‘নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটেই চলেছে। নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা, যেমন- ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও হত্যা, আত্মহত্যা, হত্যা আগের মতো বলবৎ থাকলেও শিশু ও নারীদের প্রতি শারীরিক নির্যাতন বেড়েছে। এ মাসে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট, জমি দখলের মতো ঘটনা ঘটেছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সীমান্তে হতাহতের ঘটনা বন্ধ হয়নি, অপরদিকে ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে পুশইনের ঘটনা ঘটছেই। অপরদিকে পার্বত্য এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে এক নারী ও এক যুবক গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।’
অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গণপিটুনি ও মব সহিংসতার মতো আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বন্ধ হয়নি বরং নিহত ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় এ বিষয়ে নাগরিকদের জীবনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক চর্চা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমমর্যাদা ও নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার বিষয়গুলোর নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এমএসএফ জোর দাবি জানাচ্ছে।’