রাজধানীর শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্নাসহ ১৬ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মহানগর হাকিম সারাহ ফারজানা হক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (এএমএম) আদালতের সামনে প্রিজন ভ্যানে আনা হয় আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্নাকে। লতিফ সিদ্দিকীর মাথায় পুলিশের হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। তাঁর দুই হাত পেছনে ছিল। লতিফ সিদ্দিকীর পেছনে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান। তাঁর বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় পুলিশের হেলমেট। ডান হাতে হাতকড়া, বাঁ হাতে বাংলাদেশ সংবিধান। এ সময় হাফিজুর রহমান সংবিধান বাঁ হাত ধরে উঁচু করে ধরে রাখেন। পরে তাঁদের নেওয়া হয় আসামির কাঠগড়ায়।
গতকাল লতিফ সিদ্দিকী ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেননি। তিনি আইনজীবীকে বলেন, আদালতের প্রতি তাঁর কোনো আস্থা নেই। এজন্য তিনি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেবেন না। তিনি আদালতের কাছেও কোনো বক্তব্য দেবেন না। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান বাঁ হাত দিয়ে সংবিধান উঁচু করে ধরে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন অধ্যাপক। সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে একজন নাগরিককে যেসব অধিকার দেওয়া হয়েছে, তার কোনো অধিকার আমরা পাচ্ছি না। আমাকে গ্রেপ্তার করার কোনো কারণ জানানো হয়নি। আমি কোনো আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগও পাইনি।’ হাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘আমি তো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আলোচনার জন্য মঞ্চ-৭১ নামের সংগঠনের আয়োজকরা আমাকে আলোচক হিসেবে সেখানে আমন্ত্রণ করেছিল। আমার বিরুদ্ধে যে মামলা দেওয়া হয়েছে, সেটি মিথ্যা মামলা। গতকাল আমাদের ওপর একদল সন্ত্রাসী হামলা করল, পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার না করে আমাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। আমার সম্মানহানি হয়েছে।’
সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্না কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমাকে কথা বলতে দিতে হবে। আমরা কী অপরাধ করেছি? সাংবাদিকের হাতে কেন হাতকড়া? আমরা তো সেখানে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করতে যাইনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা কি অপরাধ? আমরা কি সন্ত্রাসী?’
কারাগারে পাঠানো অন্যরা হলেন-মো. আবদুল্লাহ আল আমিন, কাজী এ টি এম আনিসুর রহমান বুলবুল, গোলাম মোস্তফা, মো. মহিউল ইসলাম ওরফে বাবু, মো. জাকির হোসেন, মো. তৌছিফুল বারী খান, মো. আমির হোসেন সুমন, মো. আল আমিন, মো. নাজমুল আহসান, সৈয়দ শাহেদ হাসান, মো. শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, দেওয়ান মোহাম্মদ আলী ও মো. আবদুল্লাহীল কাইয়ুম। গতকাল দুপুরের আগেই তাঁদের আদালতে হাজির করে শাহবাগ থানার পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহবাগ থানার এসআই তৌফিক হাসান প্রত্যেককে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। অন্যদিকে প্রত্যেকের পক্ষে তাঁদের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘মঞ্চ-৭১’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠককে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি করে। ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কিছু লোক সেখানে ‘আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন’ চেষ্টার অভিযোগে বাধা দেয়। এ সময় লতিফ সিদ্দিকীসহ অন্তত ১৬ জনকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে তাঁদের হেফাজতে নেয় গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তাঁদের ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাতে শাহবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ।