জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার সুপারিশ নিয়ে মতামত দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল রাজধানীর সংসদ ভবনের এলডি হলে ঐকমত্য কমিশনের কাছে ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে মতামত তুলে ধরেছে দলটি। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে কমিশনের কাছে দলটির মতামত হস্তান্তর করা হয়।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার কমিটির কো-অর্ডিনেটর সারোয়ার তুষার বলেন, ১৬৬টি সুপারিশের মধ্যে ১১৩টি প্রস্তাবের বিষয়ে আমরা পুরোপুরি একমত হতে পেরেছি। ২৯টি প্রস্তাবে আংশিক এবং ২২টি প্রস্তাবের বিষয়ে একমত হতে পারিনি। মতামত জানানোর পাশাপাশি দুটি বিষয়ে কমিশনের কাছে করণীয় জানতে চাওয়া হয়েছে। এনসিপির প্রতিনিধিদলে ছিলেন এনসিপির সংস্কার সমন্বয় কমিটির সদস্য মুনিরা শারমিন, জাবেদ রাশিম, আরমান হোসাইন ও সালেউদ্দিন সিফাত। সারোয়ার তুষার বলেন, আমরা বুঝতে পারছি ১৬৬টি সুপারিশের সবগুলো জুলাই চার্টারে থাকবে না। আমরা এক ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছি-৫টি কমিশন আলাদাভাবে তাদের প্রস্তাবগুলো দিয়েছে। সেখান থেকে সংক্ষিপ্ত করে ১৬৬টি স্প্রেডশিটে এসেছে। সেখান থেকে আরও সংক্ষিপ্ত করে জুলাই চার্টারে আসবে। তিনি জানান, যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো কেন বাদ দেওয়া হচ্ছে, কারণ ঐকমত্য হচ্ছে না। এসব যে জুলাই চার্টারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না তা নিয়ে কমিশন কী ভাবছে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমের তথ্য থেকে জানা গেছে, ১১টি সংস্কার প্রস্তাব দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ছাড়া বাস্তবায়নের কথা ভাবছে সরকার। এসব কী প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা হলো তাও আমাদের জিজ্ঞাসা ছিল কমিশনের কাছে। পুলিশ সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রতিবেদন না পাঠানোর বিষয়টিও ঐকমত্য কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছে এনসিপি।
যেসব বিষয়ে মতামত : সারোয়ার তুষার জানান, রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিষয়ে আপত্তি নেই। এটা হতে হবে দাপ্তরিক ভাষা। বাংলাদেশের নাগরিক বাংলাদেশি হিসেবে পরিচিত হবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকতে হবে। মৌলিক অধিকারে আরও থাকা উচিত প্রাণ ও প্রকৃতি সুরক্ষা। প্রার্থী মনোনয়নে দলকে ১০ ভাগ তরুণ-তরুণীকে অন্তর্র্ভুক্ত করা, সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর পর্যন্ত ধরা যেতে পারে। প্রার্থী হওয়ার বয়স ন্যূনতম ২৩ বছর হওয়া উচিত। ডেপুটি স্পিকার একজন হওয়া উচিত। তা বিরোধী দল থেকে। প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা একই ব্যক্তি হতে পারেন। তবে মন্ত্রিসভার মধ্যে প্রথমজন হলে এক্ষেত্রে বাধা থাকবে না। অর্থবিল ছাড়া দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে মতামত দেওয়া যাবে। পাশাপাশি দলের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটও যুক্ত করা যেতে পারে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। এক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের প্রার্থী নির্বাচনের আগে ঘোষণা করতে হবে। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) সমর্থন রয়েছে, দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যদের ভোটে যেন সিদ্ধান্ত হয়। নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার হতে হবে, তাদের কাজ শুধু নির্বাচন আয়োজন করা। এর মেয়াদ ৭০-৭৫ দিন হতে পারে। ইসি ও এনসিসি থাকলে আলাদা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দরকার নেই। দায়িত্ব নিতে পারে এনসিসি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত এনসিসি থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত করতে পারবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সংসদ চলাকালীন জরুরি অবস্থা জারির পরিস্থিতি এলে উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে হতে হবে। নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জরুরি অবস্থা জারি করা যাবে না। উচ্চকক্ষে আসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে ১ ভাগ ভোটের ভিত্তিতে হবে। নিম্নকক্ষে ১০০ নারী থাকবে। উচ্চকক্ষে দলের প্রাপ্ত আসনে ৩৩ ভাগ নির্দলীয় ব্যক্তি ও ২৫ ভাগ নারীদের জন্য বরাদ্দ। উচ্চকক্ষের জন্য সর্বনিম্ন বয়স ৩৩ বছর রাখা দরকার। শিক্ষাগত যোগ্যতার বিধান থাকতে পারবে না। স্থানীয় সরকার কমিশন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য আলাদা করা যেতে পারে। যেসব সুপারিশ সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এ সরকারই করতে পারবে। যেগুলো সংবিধান সম্পর্কিত সেগুলো গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে।
আসন্ন নির্বাচনটি গণপরিষদের মধ্য দিয়ে হওয়া দরকার- এটা এনসিপির আগেরই অবস্থান।
এক প্রশ্নের জবাবে সারোয়ার তুষার বলেন, জুলাই সনদ হবে। এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপার রয়েছে। আমরা যদি সিদ্ধান্তে আসতে পারি, সংবিধানের বড় পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান যেটাই হোক, এটা লিখিত হবে। তখন এ সংবিধানের প্রশ্নে নতুন সিদ্ধান্ত হতে পারে। এ সংবিধানকে বাতিল করা দরকার আমরা আগেই বলেছি। আগে জাতীয় ঐকমত্য হতে হবে এসব বিষয়ে। বর্তমান সংবিধান ‘সরকার পরিচালনায় প্রাধান্য পাচ্ছে না’ মন্তব্য করে গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান পুনর্লিখনের কথাও বলেন তুষার। তিনি বলেন, যেসব সংশোধনী সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, সেগুলো আমরা বলেছি নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে করা যেতে পারে।