সংস্কার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সংস্কার কমিশনগুলোর করা সুপারিশ চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু করেছে রাষ্ট্র সংস্কারে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গতকাল জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এলডি হলে অনুষ্ঠিত প্রথম দিনের সংলাপে অংশ নেয় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। দলটি জানিয়েছে, কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলোর মধ্যে ১২০টিতে একমত তারা।
কমিশন জানিয়েছে, ঈদের আগে অন্তত চারটি দলের সঙ্গে সংলাপে বসবে কমিশন। ঈদ ছুটি শেষে পর্যায়ক্রমে বাকি দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা হবে। এদিকে আগামী রবিবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দল (বিএনপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের মতামত কমিশনে জমা দেবে। বিভিন্ন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর ওপর সুনির্দিষ্ট মতামত জানতে ইতোমধ্যে স্প্রেডশিট আকারে ৩৮টি রাজনৈতিক দলের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এ পর্যন্ত ১৬টি দলের মতামত পেয়েছে কমিশন। গতকাল সংলাপ বৈঠকের প্রথম দিনে এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন দলটির মহাসচিব রেদোয়ান আহমদসহ আটজন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সঙ্গে ছিলেন সদস্য সফর রাজ হোসেন, এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
১২০টি প্রস্তাবে একমত এলডিপি : জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ১৬৬টি প্রশ্নমালার যে স্প্রেডশিট পাঠিয়েছে তার মধ্যে এলডিপি ১২০টিতে একমত বলে জানিয়েছেন দলটির প্রেসিডেন্ট অলি আহমদ। সংলাপে তিনি জানান, তাঁরা ৪২টিতে একমত নন, দুটিতে আংশিকভাবে একমত এবং দুটি অস্পষ্ট। সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৭০টি প্রস্তাবের মধ্যে ৫১টিতে এলডিপি একমত, ১৬টিতে একমত নয়, একটি আংশিকভাবে একমত এবং দুটি প্রস্তাব অস্পষ্ট বলে মনে করে দলটি।
বিচার বিভাগের ২৩টির মধ্যে ২২টিতে একমত আর একটিতে আংশিকভাবে একমত। দুর্নীতি দমনের ২০টির মধ্যে সবকটিতে একমত। জনপ্রশাসনের ২৬টির মধ্যে ১১টিতে একমত, ১৫টিতে একমত নয়। নির্বাচন সংস্কারের ২৭ প্রস্তাবের মধ্যে ১৬টিতে একমত এবং ১১টিতে দলটি একমত নয় বলে কমিশনকে জানিয়েছেন। অলি আহমদ বলেন, সব সুপারিশের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ দুর্বল ছিল। তারা অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপ করেছিল তার কাগজ সংগ্রহ করা উচিত ছিল। আপনি যত কিছুই করেন না কেন নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পারবেন না যদি দুজন লোক কাজ না করেন। একজন ওসি, আরেকজন ইউএনও। অলি আহমদ এলডিপির মতামতের কাগজ কাউকে না দিতে প্রস্তাব করেন। জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, আমরা কাউকে দেব না।
কোনো ধরনের চাপে নেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন : আলী রিয়াজ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, সংস্কার না আগে নির্বাচন- প্রশ্নে কোনো ধরনের চাপে নেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আমাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমরা তা-ই করছি। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে স্মরণ করিয়ে দিই- জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সে ক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশনের ওপর চাপের প্রশ্নই আসে না। রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্যই তাদের অবস্থান বলবে। কিন্তু কমিশন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ তুলে ধরা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারের জন্য একটা জায়গায় যেতে চাই। সুতরাং আমরা চাপে নেই।
আলী রীয়াজ বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে তারা তাদের মতামত জানাবে। আমরা অপেক্ষা করছি, আশা করছি দু-এক দিনের মধ্যেই তারা মতামত জানাবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে আলোচনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের মতামত পাওয়া গেলে ঈদের পর থেকে যেসব দলের সঙ্গে আমরা আলোচনা করব তার মধ্যে এনসিপিও থাকবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক : এদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী কমফোর্ট ইরোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সংসদ সচিবালয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশীয় কর্মসূচির পরিচালক পিয়েররি প্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠানটির মিয়ানমার ও বাংলাদেশি সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কেন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজের অগ্রগতিসহ বিবিধ বিষয়ে আলোচনা করা হয়।