পাচার অর্থ ফেরাতে অন্তত তিনটি দেশের সঙ্গে সরকার টু সরকার পর্যায়ে সমঝোতা চুক্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চুক্তির টার্গেট রয়েছে।
এই চুক্তিগুলো সম্পন্ন করতে বিভিন্ন ল ফার্ম ছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি করাপশন কো-অর্ডিনেশন সেন্টার এবং বিশ্বব্যাংকের স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ (স্টার)-এর সহায়তা নেওয়ার বিষয়েও জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান, সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাচার অর্থ ফেরাতে সাতটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছে এ সম্পর্কিত টাস্কফোর্স। প্রথম ধাপে সম্পদ অনুসন্ধান ও চিহ্নিতকরণ, দ্বিতীয় ধাপে পাচারকৃত রাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ে সহায়তা চুক্তির লক্ষ্যে চিঠি পাঠানো, ততৃীয় ধাপে অবৈধ সম্পদ সংযুক্তিকরণ, চতুর্থ ধাপে পাচার সম্পদ জব্দ করা, পঞ্চম ধাপে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, ষষ্ঠ ধাপে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য আদালতে উপস্থাপন এবং সপ্তম ও শেষ ধাপে বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে পাচার অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সূত্র জানায়, দেশ থেকে অর্থ পাচারের একটি ধারণা পেয়েছে সরকার। কিন্তু এই অর্থ কোথায়, কে কীভাবে নিয়েছে, সে বিষয়ে বিশদ কোনো তথ্য নেই সরকারের কাছে। এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তার সবই প্রাথমিক তথ্য। এই তথ্য দিয়ে পাচার অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে কারণে সবার আগে পাচার সম্পদ চিহ্নিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি যে এজেন্সিগুলোর সঙ্গে চুক্তি হবে সেগুলোকে প্রথমে সন্দেহভাজনদের তালিকা দেওয়া হবে। ওই তালিকা ধরে বিশ্বের কোথায়, কী পরিমাণ পাচারকৃত সম্পদ রয়েছে সেটিকে চিহ্নিত করা হবে। পরবর্তীতে যেসব দেশে সম্পদ চিহ্নিত করা সম্পন্ন হবে, সেই দেশগুলোকে আবেদন জানানো হবে চিহ্নিত সম্পদ জব্দ করার।
জানা গেছে, ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করা হবে বড় আকারের সম্পদ ফেরত আনার ক্ষেত্রে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। তবে ছোট আকারে পাচারকৃত অর্থ দ্রুত ফেরত আনার জন্য পৃথক প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০০ কোটি বা তার বেশি পরিমাণ অর্থ যারা আন্ডার ইনভয়েস বা ওভার ইনভয়েস অথবা সন্তানের শিক্ষা ব্যয়ের সুযোগে হুন্ডি বা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে বিদেশে টাকা পাচার করেছে, তাদের সম্পদ ফেরাতে আন্তর্জাতিক আইনি কোম্পানি (ল ফার্ম) গুলোর সহায়তা নেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, অর্থ উদ্ধারে এ ধরনের ফার্ম নিয়োগ দেওয়ার আগে ১০টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ভিত্তিতে ওইসব দেশেও ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হবে। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিন দেশের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তির লক্ষ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গেও আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। সিঙ্গাপুরের সঙ্গেও আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে পাচার সম্পদ সংযুক্তিকরণের লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চিঠি পাঠানোও হয়েছে। এর বাইরে পাচার করা টাকা উদ্ধার করতে এরই মধ্যে সরকার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সহযোগিতাও চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, পাচার সম্পদ ফেরাতে হলে প্রথমে সম্পদ চিহ্নিত করতে হবে। এরপর আইনি কোম্পানির সাহায্য বা জিটুজি (সরকার টু সরকার) সাহায্য- যে প্রক্রিয়াই হোক না কেন, তখন সেই সম্পদ ফেরত আনা বা জব্দ করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া যাবে। সে লক্ষ্যেই টাস্কফোর্সের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এরই মধ্যে জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাচার সম্পদ ফেরাতে একটি বিশেষ আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।