চলতি ২০২৪-২৫ অর্থববছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। গতকাল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট সুপারিশ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
রাজধানীর ধানমন্ডি কার্যালয়ে সিপিডি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষক মুনতাসীর কামাল ও সাঈদ ইউসুফ শাদাৎ প্রমুখ। ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের জুন থেকে ডিসেম্বর সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ৪.৪ শতাংশ, যা খুবই কম। গত বছরের ঘাটতি এবং চলতি বছর মিলে আদায়ের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৩২.২ শতাংশ অর্জন করতে অর্থবছরের বাকি প্রতি মাসে ৫৫.৫ শতাংশ আদায় বাড়াতে হবে। যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। এ ছাড়াও আরও যেসব জায়গা থেকে রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত হতে পারে, সেগুলো ধরলেও বছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়ন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ২৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হারও কমে গেছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি কমেছে, তবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব আছে সেটা অনুমোদন হলে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির ধারা বিবেচনায় চলতি বছরের জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনার বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য বাস্তবে অর্জন না-ও হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, ঋণ পরিশোধ এবং প্রত্যাশার তুলনায় বাজেটে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাতে নিট বিদেশি সম্পদ কমেছে ২.৬ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। সরকারি ব্যয় পরিচালনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। দুর্বল মানুষদের স্বার্থ সুরক্ষায় করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা উচিত বলে মনে করেন ফাহমিদা খাতুন। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের আগেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করনীতিমালা ধীরে ধীরে পরিপালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালঞ্জপূর্ণ আগামী বাজেট দেবে অন্তর্বর্তী সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া জটিল সমস্যাগুলো মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের পাশাপাশি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং কাঠামোগত স্থিতিশীলতা কীভাবে তৈরি করা যায়, তার জন্য মধ্যমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করা প্রয়োজন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ২৫ জন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার বাজেট থেকে একটি বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ভ্যাট প্রত্যাহার করা উচিত। কারণ এটা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়। বই আমদানিতে সব ধরনের কর প্রত্যাহার করা হোক। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর ১০ শতাংশ করা উচিত। সব ধরনের শিক্ষাবৃত্তি বাড়ানো হলে ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হবে। এতে ব্যয় হবে ২৬ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, এতে ১১৬ কোটি টাকা লাগবে। এ ছাড়াও জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করেছে সিপিডি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, পরিবেশ রক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য সব ক্ষেত্রে ভ্যাট ছাড় দেওয়া বিশেষ করে সৌর বিদ্যুৎ। প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি শুল্ক বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট এক্সাইজ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। দুর্বল এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীতে পুনরুদ্ধারে বরাদ্দ রাখা দরকার।