রসুলে করিম (সা.) বলেছেন, রমজানের প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের আর শেষ দশক দোজখের অগ্নি থেকে মুক্তি প্রার্থনার। মাগফিরাত কামনা প্রসঙ্গে কোরআনের উপদেশ স্মর্তব্য- ‘তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের ন্যায়, যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন এবং যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৩-৩৫); ‘তোমরা বিনীতভাবে এবং গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো, তাকে ভয় ও আশার সাথে ডাকবে’ (সুরা আ’রাফ, আয়াত ৫৫-৫৬)’। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউ অব্যাহতি পেতে না এবং আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী ও প্রজ্ঞাময়। (সুরা নূর, আয়াত ১০)’ বল, ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছো, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হইও না, আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’( সুরা যুমার, আয়াত ৫৩)
মাগফিরাত বা ক্ষমাকে জান্নাত লাভের আগে উল্লেখের দ্বারা এটা বোঝানো হয়েছে যে, জান্নাত লাভ করা আল্লাহর ক্ষমা ছাড়া সম্ভব নয়। তাফসিরে মাআরেফুল কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী- মানুষ যদি জীবনভর পুণ্য অর্জন করে এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে, তবুও তার সমগ্র পুণ্যকর্ম জান্নাতের মূল্য হতে পারে না। জান্নাত লাভের পন্থা মাত্র একটি। তা হচ্ছে আল্লাহতায়ালার ক্ষমা ও অনুগ্রহ। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মুখ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে আল্লাহর মাগফিরাত কামনা করা অন্যতম। উদ্ধৃত আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ক্ষমা তথা জান্নাত কাদের জন্য? মুত্তাকিদের জন্য। মুত্তাকি কারা? যারা সচ্ছল অসচ্ছল অবস্থা নির্বিশেষে ব্যয় করে আল্লাহর পথে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী, মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, সৎকর্মপরায়ণ এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। তবে তাদের পাপের ক্ষমা প্রার্থনা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যারা ওই পাপ কাজে জেনেশুনে আর লিপ্ত না হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
যাবতীয় অনুকম্পা ও নিয়ামতদানকারী আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে বিপদেআপদে অভাব অনটনে তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ আদবের শিক্ষাও এখানে রয়েছে। বলা হয়েছে, অপারগতা ও অক্ষমতা এবং বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে দোয়া করা তা কবুল হওয়ার জন্য জরুরি শর্ত। দোয়ার ভাষাও অক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বলার ভঙ্গি ও দোয়ার আকার আকৃতিও বিনয় ও নম্রতাসূচক হওয়া উচিত। দোয়া প্রার্থনা যাতে দোয়া পাঠে পরিণত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট বাক্য অর্থ না বুঝে মুখস্থ আওড়ানোর মধ্যে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অন্যের পাঠ করা সেই দোয়া না বুঝে শুধু ‘আমিন’ উচ্চারণের মধ্যে দোয়ার নি®প্র্রাণতা প্রকাশ পায়। বলার ভক্সিগ এবং বাহ্যিক আকার আকৃতিতে বিনয় ও নম্রতা ফুটে না উঠলে দোয়া অভিনয় ও দাবিতে পরিণত হতে পারে।
[সাবেক সচিব। এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান]