কেউ কাউকে ভালোবাসলে, তাকে পাওয়ার জন্য, তার মন জয় করার জন্য কত কিছুই না করে। অনেক কিছু করার পরও প্রেমিকের মন ভরে না। এভারেস্ট জয় করার মতো কষ্ট করেও মনে হয় কিছুই করতে পারলাম না। আবার কাউকে ভালো না বাসলে তার জন্য কিছুই করতে মন চায় না। এটাই মানব প্রকৃতি। আমরা সবাই দাবি করি আল্লাহকে ভালোবাসি। তাহলে আল্লাহর জন্য আমরা কী করছি সেটা বিশ্লেষণের সময় এসেছে। আল্লাহকে ভালোবাসার একটা বড় লাভ হলো, এতে বান্দা নিজেই লাভবান হয়। আল্লাহ মানুষের ভালোবাসার মুখাপেক্ষী নয়, তবে মানুষ আল্লাহর ভালোবাসা ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারে না।
হে আমার রোজাদার ভাই! হে আমার সিয়াম সাধক বন্ধু! নিজেকে জিজ্ঞেস করুণ! আমি কি আমার মাওলার মন জয় করতে পেরেছি? আমার অসহায়-কমজোরি দেখিয়ে কি আমার মাওলার মনে দয়া জাগাতে পেরেছি? হ্যাঁ! মাওলার মনে দয়া জাগানোটাই বড় কথা। আসল প্রাপ্তি। আমাদের মাবুদ রাব্বানা তো দয়ার সাগর। তিনি যদি একবিন্দু দয়া করেন, তবে এই নাচিজ বান্দার জীবনে এক সিন্ধু খায়র-বরকত নেমে আসবে। এত বেশি কল্যাণ নসিব হবে যে, একজীবনেও তা শেষ হবে না। তার দয়ায় মরুভূমিতেও ফুল ফোটে। মহাসমুদ্রেও কূল জাগে। তাহলে আমার আপনার জীবনে কেন বসন্ত আসবে না? হে আমার ভাই! জীবনে যদি খোদা প্রেমের বসন্ত আনতে চান, যদি আনন্দ-সুখের ফুল আপনার জীবনে ফোটাতে চান, হতাশা-ব্যর্থতার আগাছা যদি জীবনের বাগান থেকে ঝেড়ে ফেলতে চান- তাহলে আর কিছু প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু দয়াময়ের একবিন্দু দয়া। সেই দয়া চেয়ে নিতে হয়। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে প্রভুর মন গলিয়ে দয়া পেতে হয়। আপনি যখন রাস্তায় নামেন তখন কী দেখেন? একজন মানুষ আপনার কাছে হাত পেতেছে। শত কঠিন চেহারা হলেও সে কান্নার ভান করে। বাসায় তার ভালো জামা থাকলেও আপনার সামনে সে ছেঁড়া জামা গায়ে আসে। হয়ত একটু আগেই সে পেটপুড়ে খেয়ে এসেছে। কিন্তু আপনাকে বলবে, তিন দিন হল কিছু খাইনি। ভাই দুইটা টাকা দ্যান।
আপনি হয়ত অবাক হবেন। তিন দিন না খাওয়া মানুষটার দুই টাকায় কী হবে? আসলে সে আপনার মন গলাতে চাইছে। যাতে আপনার মনে তার জন্য মায়া জাগে। মানুষ যদি মানুষের কাছে এভাবে চায়, তার মন গলাতে এত অভিনয় করতে হয়, তো আপনি যখন আল্লাহর কাছে চাইবেন, তখনো তো আপনাকে অভিনয় করতে হবে। আসলে অভিনয় নয়। আমাদের বাস্তব অবস্থাই খোদার সামনে তুলে ধরতে হবে। কী আছে আমার? কী পরিচয়ে আমি বিশ্বরাজাধিরাজের দুয়ারে এসেছি? আমার কিছু নেই। আমার কোন পরিচয় নেই। আমার পরিচয় একটাই। আমি বিশ্বরাজাধিরাজ দরবারের একজন অতি নগন্য ফকির। রাজা যদি দয়া করে আমার দিকে তাকান, একটু যদি আমার কথা তিনি ভাবেন। ব্যস! আমার দুনিয়াও সফল। আখেরাতও সফল।
এভাবেই নিজের দীনতা-হীনতা যতবেশি আল্লাহর কাছে বলা যায়, ততবেশি তার দয়া আপনার কাছে ছুটে আসবে। নবিজি (সা.) বলেছেন, তুমি যখন তোমার প্রভুর সান্নিধ্যে একান্ত কিছু সময় কাটাবে, তাঁর কাছে মনের আকুতি-মিনতি জানাবে, তখন তুমি কান্নাকাটি করে জানাও। যদি কান্না না আসে তবে কান্নার অভিনয় করো। নিজের ক্ষুদ্রতা উপলদ্ধি করে তার সামনে চাও। খবরদার! নিজেকে বড় কিছু ভেবে বসো না। যখন তুমি তার কাছে চাইবে, হৃদয়ের ভাষা দিয়েই চাইবে। ভাষা সুন্দর করার জন্য কবিতার মত ছন্দ দিয়ে চেয়ো না। সাহিত্য মিশিয়ে দোয়া করো না। তুমি তো ফকির। ফকির কি ভিক্ষা করার সময় কবিতা বলে? সে কি সাহিত্য মিশিয়ে কিছু চাইতে আসে? সে চায় কাঁদো কাঁদো চেহারায়। ভাঙা ভাঙা গলায়। হাত উঁচু করে। স্বর নরম করে। তুমিও এভাবে আল্লাহর কাছে চাও। মিনতি করে চাও। আল্লাহ তোমাকে দেওয়ার জন্য বসে আছেন। তোমার জীবনে সৌভাগ্য দুয়ার খুলে যেতে পারে একটি সরল মুনাজাতেই। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর, www.selimazadi.com