গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৫২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার অভিযোগের প্রাথমিক যাচাইবাছাই সম্পন্ন করেছে কমিশন। গুম হওয়া ৩৩০ জন সম্পর্কে এখনো কোনো খবর মেলেনি। তাদের ভাগ্য অনুসন্ধানের কাজ চলমান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে তারা এসব ঘটনায় জড়িয়েছেন বলে জানিয়েছে গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। গুমের বিষয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন গুম কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। গতকাল গুলশানে গুম কমিশনের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় জানান কমিশন সভাপতি। এ সময় কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমদ শিবলী, নূর খান, ড. নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি নাগরিক গুম করার অভিযোগ আছে জানিয়ে কমিশন সভাপতি বলেন, এসব ঘটনার দায় সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়। তাই কোনো বাহিনীর সদস্যদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতের মাধ্যমে বাহিনীর দায়মুক্তি সম্ভব। কেউ অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করলে তিনি অপরাধী হবেন।
একটা বাহিনীর ছত্রছায়ায় থেকে কতিপয় ব্যক্তি গুমের ঘটনায় জড়াতে পারেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশের কারণে ওই ব্যক্তিরা গুমের ঘটনা ঘটায়। এ ব্যাপারে আমরা তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে আমাদের প্রতিটি ফাইন্ডিং তুলে ধরব। রাজনীতি না করেও অনেকে গুমের শিকার হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অ্যাম্বাসাডর মারুফ জামান রাজনীতি করতেন না। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা করায় তাকে গুম করা হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বিজিবির সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের তথ্য চাওয়া হলে পুলিশের পক্ষ থেকে ১৪০ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সেখানে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ্ নামক গুমের শিকার ব্যক্তিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর বর্ডার দিয়ে পুশইন করা হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে গত দুই-আড়াই বছরে আটক ১ হাজার ৬৭ জন বাংলাদেশির নাম-ঠিকানাসহ একটি তালিকা পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তালিকায় গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম আছে কি না তার অনুসন্ধান চলমান। ৭৪টি অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর পাঠানো হয়েছে।
৫ আগস্টের পর কোনো গুম হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশন সভাপতি বলেন, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে গুম হওয়ার বিষয়গুলো কমিশন দেখবে। এর বাইরে কমিশনের দেখার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশে গুম যাতে চিরতরে বন্ধ হয় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সুপারিশ কমিশনের প্রতিবেদনে থাকবে।
কমিশন নির্মোহভাবে ও নির্বিঘ্নে কার্যক্রম পরিচালনা করছে জানিয়ে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এ পর্যন্ত ২৮০ জন অভিযোগকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৫ সদস্যের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিজিএফআই মহাপরিচালক, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। ঢাকা, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ডিজিএফআই, সিটিটিসি ও র্যাবের নিয়ন্ত্রণাধীন গোপন বন্দিশালা চিহ্নিত করে কমিশন সেগুলো অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশের পর দায়িত্বশীলরা আর এগুলো পরিবর্তন করেননি।