কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া ও সমিতিপাড়ায় বিমান বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সংঘর্ষে শিহাব কবির নাহিদ (৩০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। গুলিতে নিহত যুবক নাহিদ কক্সবাজার পিটিআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট নাসির উদ্দীন ও কক্সবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষকা আমেনা বেগমের একমাত্র ছেলে। গুলিবিদ্ধ শাহাদাত (৩৮)-সহ পাঁচজনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতের বাবা নাসির উদ্দীন বলেন, ঘরের উঠানে থাকা অবস্থায় হঠাৎ গুলি এসে তার ছেলের মাথায় লাগে। তার মাথা গুলিতে থেঁতলে যায়। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিহাবের বাবার আহাজারি
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গতকাল দুপুরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানিয়েছে, ‘কিছু দুর্বৃত্ত বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে বিমান বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।’
ঘটনার সূত্রপাত : কক্সবাজার বিমানবন্দরের পশ্চিমে শেখ হাসিনা বিমান ঘাঁটি করার জন্য কিছু জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। উচ্ছেদকৃত কিছু মানুষকে শহরের অদূরে খুরুশকুলে পুনর্বাসনও করা হয়েছে। সম্প্রতি বাকি বসতি উচ্ছেদ না করার জন্য স্থানীয় জনগণ জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি দেয়। এরই সূত্র ধরে গ্রামবাসী-বিমানবাহিনী ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা চলছিল। জেলা প্রশাসক ঢাকায় ব্যস্ত থাকায় এক সপ্তাহের মধ্যে কোনো সভা হয়নি। গত ৭ জানুয়ারি ১ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ শহরের প্রধান সড়ক অবরোধ করে উচ্ছেদ বন্ধের দাবি জানান। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানান, সমিতিপাড়ার উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকা একদল লোক সকালে সাবেক এমপি লুৎফর রহমান কাজলের সঙ্গে মতবিনিময় করে ফেরার পথে বিমান বাহিনীর ডায়াবেটিস পয়েন্ট চেক পোস্টে সমিতিপাড়ার উচ্ছেদবিরোধী প্রতিনিধি দলের নেতা শিক্ষানবিশ আইনজীবী জাহেদকে বিমান বাহিনীর সাদা পোশাকধারী একটি দল আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এ খবর সমিতিপাড়ায় ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে জাহেদকে ছাড়াতে বিমান বাহিনীর ঘাঁটিমুখী হয়। একপর্যায়ে এলাকাবাসী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, বিমান বাহিনীর একটি দল গ্রামবাসীকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে গ্রামবাসী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এ সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন নাহিদ। তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সংঘর্ষের সময় বিমান বাহিনীর সদস্যরা গুলি ছোড়ে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
থমথমে পরিস্থিতি : শিহাবের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে বিমান বাহিনীর ঘাঁটির দিকে আসতে থাকেন। সাবেক এমপি লুৎফর রহমান কাজল, সাবেক মেয়র সরওয়ার কামালসহ নেতৃস্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে লোকজনকে সরিয়ে দেন। এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও র্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে।
হাজার মানুষের মধ্যে ৯০ শতাংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু : কক্সবাজার বিমানবন্দরে পশ্চিমে সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়াসহ ২২টি গ্রাম-মহল্লা নিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড। ৭০ হাজার বাসিন্দার ৯০ শতাংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু। ১৯৮২ সাল থেকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি হারিয়ে কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে ১ নম্বর নম্বর ওয়ার্ডের খাসজমিতে আশ্রয় নেন। সেখানে ২৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৪ মসজিদ-মাদরাসা রয়েছে। দেশের বৃহত্তর নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লীকে ঘিরে এখানে বসতি গড়ে উঠেছে। কয়েক বছর ধরে কিছু এলাকায় বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব জায়গা থেকে উচ্ছেদ হওয়া লোকজনের জন্য শহরের অদূরে খুরুশকুলে ১৩৭টি পাঁচতলা ভবনের বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে।
নাহিদের বাবা-মা ও স্ত্রীর আহাজারি : নিহত নাহিদের মা-বাবার আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। গুলিতে ছেলের মৃত্যু হয়েছে দাবি করে নাহিদের বাবা নাসির উদ্দিন বলেন, ইটপাটকেল নিক্ষেপের সময় ছেলে (শিহাব) ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ একটি গুলি মাথায় এসে লাগে। গুলি মাথার খুলিতে লেগে মগজ বেরিয়ে আসে।
এলাকাবাসীর সংবাদ সম্মেলন : এদিকে গতকাল বিকালে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে ১ নম্বর ওয়ার্ড জনসাধারণের উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন মাওলানা ফোরকান রশিদ, এজাবত উল্লাহ, সাবের আহমদ ও দিদারুল ইসলাম রুবেল। তারা দাবি করেন, আইএসপিআর যে বক্তব্য দিয়েছে তা সত্য নয়। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন এবং ওই খাসজমি এলাকাবাসীর নামে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান।
জানাজা : গতকাল রাত ৮টায় কক্সবাজার হাইস্কুল মাঠে নাহিদের প্রথম জানাজা ও রাত ৯টায় সমিতিপাড়ায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
আইএসপিআর-এর বক্তব্য : আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গতকাল দুপুরে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কক্সবাজারে বিমান বাহিনী ঘাঁটিসংলগ্ন সমিতিপাড়ার কিছু স্থানীয় দুর্বৃত্ত সোমবার বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। বিয়াম স্কুলের পাশে বিমান বাহিনীর চেকপোস্ট থেকে একজন স্থানীয় লোকের মোটরসাইকেলের কাগজপত্র না থাকায় বিমান বাহিনীর প্রভোস্ট কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঘাঁটির অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সমিতিপাড়ার আনুমানিক ২ শতাধিক স্থানীয় লোকজন বিমান বাহিনীর ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হলে বিমান বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাধা দেয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে বিমান বাহিনীর চেকপোস্ট এলাকায় বিমান বাহিনীর সদস্য ও সমিতিপাড়ার কতিপয় দুষ্কৃতকারী লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলে কতিপয় কুচক্রী মহলের ইন্ধনে দুর্বৃত্তরা বিমান বাহিনীর সদস্যদের ওপর ইট পাটকেল ছোড়ে। এসময় দুর্বৃত্তদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে কয়েকজন আহত হন। যার মধ্যে বিমান বাহিনীর চারজন সদস্য আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং শিহাব কবির নাহিদ নামের এক যুবককে গুরুতর আহত অবস্থায় বিমান বাহিনীর গাড়িতে করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার্থে বিমান বাহিনীর সদস্যরা কর্তৃক বিমান বাহিনীর রুলস অব এনগেজমেন্ট অনুয়ায়ী ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়, তবে স্থানীয় জনসাধারণের ওপর কোনো প্রকার তাজা গুলি ছোড়া হয়নি।
একটি কুচক্রী মহল বিমান বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে সামাজিক মাধ্যমে বিমান বাহিনীর গুলিতে ওই যুবক নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যি নয়।