ঝিনাইদহের শৈলকুপার মির্জাপুরে শুক্রবার রাতে নিহত জনযুদ্ধ লাল পতাকার (এমএল) তিন চরমপন্থির পরিচয় মিলেছে। তারা হলেন- হরিণাকুন্ডু উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের আহাদনগর গ্রামের মৃত রাহাজ উদ্দিনের ছেলে চরমপন্থি দল নেতা হানিফ মন্ডল, তার শ্যালক একই উপজেলার সিরামপুর গ্রামের উম্বাদ আলীর ছেলে লিটন হোসেন (৪০) ও হানিফের দেহরক্ষী কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার পিয়ারপুর গ্রামের মৃত আরজেদ আলীর ছেলে রাইসুল ইসলাম (৩৫)। ঘটনার দায় স্বীকার করে জাসদ গণবাহিনীর নামে সাংবাদিকদের মেসেজ পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, কায়েতপাড়া বাওড়ের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুইদল চরমপন্থি শুক্রবার দিবাগত রাত আটটার দিকে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে উভয়পক্ষের মধ্যে প্রায় ৮/১০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়। এ সময় গোলাগুলির শব্দে রামচন্দ্রপুর, পিয়ারপুর ও ত্রিবেনী গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল শৈলকুপার মির্জাপুর শ্মশান খাল এলাকাটি হরিণাকুন্ডু শৈলকুপা এবং কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার মধ্যবর্তী দুর্গম বিল এলাকায় অবস্থিত। এলাকাবাসী পার্শ্ববর্তী শৈলকুপার রামচন্দ্রপুর পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়। এরপর এলাকাবাসীর সহায়তায় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিন চরমপন্থির গুলিবিদ্ধ লাশ এবং তাদের ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল ও একটি ম্যাগাজিনসহ বেশ কিছু গুলির খোসা উদ্ধার করে। নিহত তিনজনের মাথায় গুলি করে ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে বলে রামচন্দ্রপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মতিয়ার রহমান নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এমএল জনযুদ্ধ ও জাসদ গণবাহিনী নামের দুটি চরমপন্থি দলের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। শুক্রবার রাতে রামচন্দ্রপুর শ্মশানঘাট এলাকায় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এমএল জনযুদ্ধের নেতাদের গোপন বৈঠকের খবর পায় প্রতিপক্ষ গ্রুপ। তবে জাসদ গণবাহিনীর শীর্ষ নেতা কালুর নেতৃত্বে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্রটি আরও জানায়, নিহত হানিফ মন্ডলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় কমপক্ষে ১৩টি হত্যাসহ অনেক মামলা রয়েছে। বিগত ২০০৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মির্জাপুর শ্মশান খালের ওই স্থানে অন্য পাঁচজনকে হত্যা করেছিল চরমপন্থিরা। নিহত জনযুদ্ধের আঞ্চলিক প্রধান হানেফ মৃত্যুদন্ডের আসামি ছিলেন। হরিণাকুন্ডু উপজেলার কুলবাড়িয়া গ্রামের আবদুর রহমান হত্যা মামলায় তার ফাঁসির আদেশ হয়। উচ্চ আদালতেও ফাঁসির রায় বহাল থাকলে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিশেষ ক্ষমায় প্রাণভিক্ষা পেয়ে এলাকায় ফিরে এসে ফের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে হানিফ। এরপর মৎস্যজীবী লীগের হরিণাকুন্ডু উপজেলা কমিটির সহসভাপতি নির্বাচিত হন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর দুর্ধর্ষ চরমপন্থি হানিফ আবারও রাজনৈতিক রং পাল্টে পুনরায় এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই ট্রিপল মার্ডারের নেপথ্যে রয়েছে পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কায়েতপাড়া বাঁওড়। বাওড়টিতে বছরে কোটি টাকার ওপরে মাছের চাষ হয়। সম্প্রতি মৎস্যজীবী লীগ নেতা পরিচয়ে হানিফ বাওড়ে মাছ ধরা ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে এলাকার একাধিক গ্রুপের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। সেই সূত্র ধরেই হানিফসহ তার দুই সহযোগীকে গুলি করে হত্যা হয়েছে। কায়েতপাড়া এই বাঁওড়টি নিয়ে গত ৩০ বছরে অর্ধশত মানুষ খুনের শিকার হয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, চরমপন্থি নেতা হানিফ ইতোপূর্বে কুলবাড়িয়া গ্রামের আবদুর রহমান, তিওরবিলা গ্রামের লুৎফর রহমান, তাহেরহুদার আবদুল কাদের ও পোলতাডাঙ্গার ইজাল মাস্টারসহ প্রায় ১০ জনকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ইজাল মাস্টারকে হত্যার পর তার মাথা কেটে ফুটবল খেলেছিল হানিফ। সে সময় বিষয়টি দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পর চরমপন্থিদের মধ্যে হানাহানি ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রদান নিয়ে এলাকায় জনমনে আতংকের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, একই স্থানে ২০০৩ সালের ৫ ডিসেম্বর শৈলকুপার শেখপাড়া গ্রামের শহীদ খাঁ, ত্রিবেনী গ্রামের শাহনেওয়াজ, একই গ্রামের ফারুক, নুরু কানা ও কুষ্টিয়ার ভবানীপুর গ্রামের কটাকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করে চরমপন্থিরা। এই মামলায় ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর কুষ্টিয়ার আলী রেজা ওরফে কালু ও কুষ্টিয়ার ইবি থানার পিয়ারপুর গ্রামের মহসিন আলীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। ঝিনাইদহ জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মো. জাকারিয়াহ এই দন্ডাদেশ দেন।
অন্যদিকে শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে এটা নিশ্চিত। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার কিছু দূরে সড়কের ওপর দুটি কালো রঙের মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি। তবে শৈলকুপা থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠন জাসদ গণবাহিনীর কালু গ্রুপের প্রধান কমরেড কালু হোয়াটসঅ্যাপে সাংবাদিকদের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি বার্তায় উল্লেখ করেছেন ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, যশোর, খুলনাবাসীর উদ্দেশ্যে জানানো যাচ্ছেথ- পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নামধারী কুখ্যাত ডাকাত বাহিনীর শীর্ষ নেতা অসংখ্য খুন, গুম, দখলদারি, ডাকাতি ও ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হরিণাকুন্ডু নিবাসী হানিফ তার দুই সহযোগী জাসদ গণবাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। এই অঞ্চলে হানিফের সহযোগীদের শুধরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। অন্যথায় আপনাদের একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে এই হত্যার দায় স্বীকার করা হলেও বিষয়টি রহস্যঘেরা বলে অনেকে মনে করছেন।