ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, চায়নিজ ও অন্যান্য বিদেশি ভাষার পাশাপাশি বাংলা শেখানো হয়। যদিও অনেকের কাছে মনে হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার জন্য তো বাংলা বিভাগ আছেই, সে ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার কোর্সের কী প্রয়োজন! কিন্তু এ বাংলা ভাষার কোর্সটি আসলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যারা বাংলা ভাষা শিখতে আগ্রহী।
সালাম, বরকত, রফিকদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ বাংলা ভাষা ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর বাংলার পরিচিতি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে; যার কারণে ইউরোপ ও অন্য অনেক দেশের মানুষ বাংলা ভাষা শিখতে আগ্রহী হচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থী যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে সার্টিফিকেট কোর্সে বাংলা শিখতে আসেন, এদের মাঝে কেউ গবেষণার জন্য রেফারেন্স তৈরি করতে বাংলা ভাষা শেখেন, কেউ আবার অনুবাদের কাজের সঙ্গে যুক্ত। আরও কিছু শিক্ষার্থী আসেন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে। এদের মাঝে বেশির ভাগ চীনা ও জাপানি। সবচেয়ে বেশি আসে চীন থেকে। চীনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, এশিয়ান স্টাডিজের মতো বিভাগ আছে যেখানে বাংলা পড়ানো হয়। এসব শিক্ষার্থীর মাঝে অনেকে বাংলা শিখতে এক সেমিস্টারের জন্য বাংলাদেশে আসেন। চার-পাঁচ বছর ধরে আমরা খেয়াল করেছি চীনা শিক্ষার্থীরা এ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে বেশি আসছেন। এটা হতে পারে চীন এখন অর্থনীতি এবং অন্যান্য দিকে পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলেছে। তাই তারা হয়তো গবেষণা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য এ দূরদর্শী ভাবনা থেকে তাদের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দেশে ভাষা শেখানোর জন্য পাঠাচ্ছে।
প্রতি বছর সব মিলিয়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে সার্টিফিকেট কোর্সে বাংলা শিখতে আসেন ১০ থেকে ১২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী। এ ছাড়া আন্ডারগ্র্যাজুয়েট চীনা শিক্ষার্থী গড়ে ২০ জনের মতো আসেন। আগে এ সংখ্যাটি অনেক কম ছিল কিন্তু এখন বেড়েছে। চীনা সরকার বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই মনে হয় তাদের সংখ্যাটা বেশি। শুধু চীন থেকেই আমাদের দেশে আসেন এমন নয়, আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দিয়ে মাস্টার্সের জন্য চীনে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে তারা। প্রতি বছর এ সংখ্যাটা ১০-১৫-এর মতো প্রায়।
চীনের মতো দেশগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে পাঠায় মূলত মানবসম্পদ তৈরির জন্য। শিক্ষার্থীদের রিসার্চার বানানো, ব্যবসায় ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। আমাদের দেশ থেকে যারা চীনে ব্যবসায় বা চিকিৎসার জন্য যাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং সেবা দেওয়ার জন্য বাংলা ভাষা জানা চীনাদের তারা কাজে লাগাতে পারবে যেন আরও ভালো সেবা দেওয়া যায়। ইউরোপের মতো দেশগুলো থেকে যারা বাংলা শিখতে আসে এদের অনেকেই দেখা যায় গুগল ট্রান্সলেটর, ফ্রিল্যান্সার, জার্নালিস্ট বা রিসার্চার। তারা চাইলে নিজ দেশে থেকেও বাংলা শিখতে পারে কিন্তু উদ্দেশ্য কেবল ভাষা শেখা নয়। তারা চায় ভাষা শেখার সুবাদে এ দেশের মানুষ, সংস্কৃতি সম্পর্কে বুঝতে ও জানতে। এখানে ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা এবং কাজ নিয়ে তারা নিজ দেশে আরও ভালো ভালো কাজ করতে পারে।
আমাদের যেহেতু বিদেশি ভাষা হিসেবে বাংলার ওপর অনার্স-মাস্টার্স কোর্স নেই, সেহেতু আমরা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এ সেবা দিতে পারছি না। তবে আমরা আশাবাদী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ যদি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয় তাহলে বাংলা ভাষা আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে আরও সমৃদ্ধ করতে পারব। সরকারেরও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বাংলা ভাষার ওপর অনার্স-মাস্টার্স চালু করতে না পারার একটা প্রতিবন্ধকতা হলো, অনেকে ভাবে বাংলা বিভাগ তো আছেই, তাহলে এটা কেন লাগবে! কিন্তু বাংলা বিভাগ কেবল বাংলা সাহিত্য পড়ার জন্য। আর বাংলা ভাষার কোর্স হচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে ইংরেজি বিভাগ আছে আবার আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও ইংরেজি ভাষার জন্য অনার্স-মাস্টার্স আছে। এভাবে বাংলা ভাষার জন্যও চালু করা জরুরি। ১৯৭৪ সালে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অগ্রযাত্রা হয়েছিল। এখানে চীনা, ফরাসি, জাপানিজ ও ইংরেজি ভাষার অনার্স-মাস্টার্স আছে কিন্তু অন্য ভাষার ওপরে নেই। কিন্তু একইভাবে পাকিস্তানেও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট যাত্রা করে ১৯৭২-এর দিকে; যা ইতোমধ্যে বিদেশি ভাষা শেখার জন্য পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেছে। বাংলাদেশে যেহেতু বিদেশি ভাষা শেখার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটকে সে জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। যদিও আমরা জানি না সেটা কবে নাগাদ সম্ভব। কিন্তু এটি আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
আমাদের দেশে আমরা ভাষা শেখার বেলায় খুবই অবহেলা করছি। আমরা বাংলা, ইংরেজি বাদে অন্য ভাষা শিখতে খুবই অনাগ্রহী। আমি চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে অনার্সের যেন একটা সেমিস্টারে অন্তত একটা বিদেশি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এ এ ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। আমরা যদি এভাবে শিক্ষার্থীদের অন্তত এক সেমিস্টারের জন্য হলেও বিদেশি ভাষা শেখার ব্যবস্থা করি তাহলে তারা ভবিষ্যতে ভাষা শেখার ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ উদ্যোগ শুরু করলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তা অনুসরণের চেষ্টা করবে বলে আমার প্রত্যাশা।
লেখক : পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট