বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতায় এক বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ৫ আগস্ট। পরিবর্তন এসেছে বাস্তবতায়, প্রত্যাশায়। হাজারো, লাখো, কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন, ক্ষোভ, ভালোবাসার স্ফুরণ ঘটেছিল, সেদিন প্রাণবন্ত স্বতঃস্ফূর্ততায়। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এই ৫ আগস্ট আমাদের মাঝে বুনে দিয়েছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। এঁকেছিল সুখী, সমৃদ্ধ, শোষণহীন, স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন।
তবে অধিকাংশ সময়েই যা হয়! বাস্তবতা এবং কল্পনার সঙ্গে প্রত্যাশার দ্বন্দ্ব। বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনীতি অনেকটাই যেমন খুশি তেমন সাজো ঢংয়ে এগিয়ে গেছে। দেশের বর্তমান যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তা স্মরণকালে কেউ দেখেছেন, এমনটা দাবি করছেন না। দাবি করছেন না নির্ভয়ে স্বাধীন দেশে ঘুরে বেড়াবার, কথা বলার কথা। সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই হাইপার ম্যাজিক রিয়েলিজম। বিশেষ করে অর্থনীতিতে পতিত সরকারের ডায়নামিক দুর্নীতির পর করাপ্টেড সিস্টেমকে সঠিক পথে পরিচালনার প্রয়াসকে অনেকেই হাইপার ম্যাজিক রিয়েলিজমেরও মিলিয়ে নিচ্ছেন। যেখানে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ছিল মুক্ত বাংলাদেশে একটু শান্তিতে থাকার, সেখানে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, নৈরাজ্য, সম্পদ ও আয়বৈষম্য, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার মতো ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। চলতি পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছর নিয়ে বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশীয় বিন্দু কম।
ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে মিল রেখে, দেশে বিনিয়োগ কমার চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যেও। বিডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যবসার ৭৪২টি প্রকল্পে ১ হাজার ১৬৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ নিবন্ধন হলেও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকেই ২৫৪ প্রকল্পে ৬৬৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনকালীন জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তা কমে ১৮৬ প্রকল্পে মাত্র ১৮৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার হয়। বেড়েছে বেকারত্ব, পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে এখন ২৬ লাখ ৬০ হাজার। আগের বছর একই সময় দেশে বেকার জনগোষ্ঠী ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেকার বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার। পাশাপাশি বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত বছর একই সময় তা ছিল ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। বিনিয়োগ কমার চিত্র উঠে এসেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই-নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ।
প্রকট মূল্যস্ফীতির বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব, দেশে ডিসেম্বর শেষে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। গত ১৪ আগস্ট আশা প্রকাশ করেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, পাঁচ থেকে ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি সহনীয় হবে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বেশ কিছু দিন অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ থাকার পরও এসব শিল্প ঘিরে এখনো থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
দেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে (এফডিআই) বড় ধরনের পতন হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে গত অর্থবছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৭১ শতাংশ, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বর্তমানে দেশে বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ নেই। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকের সুদের হার বেশি, নানা রকমের সমস্যা, ব্যাংকগুলোর চরম অসহযোগিতাসহ নানা কারণে একেবারেই বিনিয়োগ নেই।’ বিনিয়োগ কমার চিত্র উঠে এসেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই-নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বলছে দেশের চলমান অর্থনীতি পথে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন শক্তিশালী পদক্ষেপ। যা বাস্তবায়নে গ্রহণ করা প্রয়োজন জোরালো পদক্ষেপ। তবে সেই শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া ও বাস্তবায়ন বর্তমানের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে যথেষ্ট কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ টেকসই অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক নিয়মতান্ত্রিকতা। আর তাই দেশের বিপ্লব, গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন দ্রুত নির্বাচন এবং নতুন দিনের পরিকল্পনা।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও মিডিয়াব্যক্তিত্ব