আইনকানুন শব্দটি পৃথিবীর সব দেশে, সব সমাজে বহুল পরিচিত। এই আইন-কানুন দ্বারাই মূলত মানুষের জীবন, সম্পত্তি, সমাজ, দেশ- সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু এ আইন-কানুন কারও জন্য আশীর্বাদ আবার কারও জন্য নিকষ কালো অমানিশা, ফলে আইনের উদ্দেশ্য, ফলাফল ও কার্যকরণের ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য, বৈপরীত্য ও চরম ভিন্নতা দেখা যায়। এরূপ ভিন্নতা আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আইন সব নাগরিকের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য নয় এবং আইন সমভাবে প্রয়োগ করা যায় না। বিভিন্ন দেশ, কাল ও শাসক শ্রেণি আইনের সব উদ্দেশ্যকে প্রতিনিয়ত পরাভূত করে চলেছে। ধনী-গরিব, সাধারণ মানুষ আর ক্ষমতাধর মানুষের ক্ষেত্রে আইন সমভাবে প্রয়োগযোগ্য হয় না। জানুয়ারি ২০২৫ সালেই একটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে নৈতিক অপরাধের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার পরও দণ্ড প্রদান করা থেকে আদালত বিরত থাকার সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
আইনের জগতে একটি কথা বিজ্ঞ ও দার্শনিকগণ বলে থাকেন- ‘যেখানে Rule of Law তথা আইনের শাসন নেই; সেখানে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানুষের মৌলিক অধিকার থাকতে পারে না।’ এ কথার বাস্তবচিত্র কি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ নয়? যে দেশে গরিব আরও গরিব ও অসহায় হয়, যে দেশে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে সর্বস্তরের অধিকাংশ মানুষই আকণ্ঠ নিমজ্জিত, সে দেশের মানবিক মূল্যবোধহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লুটপাট ও টেন্ডারবাজিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, যে দেশের ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় ও প্রশ্রয়ে নানান ধরনের সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত, যে দেশে রাষ্ট্রের মদতপুষ্ট বাহিনীর হাতে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে নিহত ব্যক্তিদের বিচারহীনতা বিষয়ে বিচার বিভাগ অসহায়, যে দেশের শান্তিরক্ষাকারী বাহিনী অর্থ লোপাট করে ও জনগণের বুকে গুলি চালায়, যে দেশে পুলিশ বাহিনীকে সরকারি অফিসে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, যে দেশের কথিত জনসেবকগণ দুর্নীতির অভিযোগে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয় এবং যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণ জনরোষে পদত্যাগে বাধ্য হন- সে দেশে আইনের শাসনের কথা বলা তামাশা ও আত্ম প্রবঞ্চনা ছাড়া কিছুই না।
যে দেশের রক্ষক, অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিদের এহেন অবস্থা সে দেশে মানুষের অধিকার সত্যিই পরাভূত। মানবিক মূল্যবোধহীন এ সমাজকে বর্বর সমাজ বললে কি ভুল হবে?
সব ধর্মের ধর্মীয় বিধানে মানবসেবা, পরোপকার, অসহায় অভুক্তকে অর্থ ও খাদ্য সহায়তার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব ও তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। আল কোরআনের প্রারম্ভেই বলা হয়েছে- “আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় (অসহায়-অভুক্তদের জন্য) করে”। সুরা মাউনে এতিম, অসহায় ও অভুক্তদের খাদ্য সহায়তার কথা বলা হয়েছে। কোরআনের বহু স্থানে অর্থ ও খাদ্য সহায়তার কথা কেবল বলাই হয়নি বরং বাধ্যতামূলক করে বলা হয়েছে। “তোমাদের সম্পদে বঞ্চিতদের অংশ আছে।” সব নবী, রসুল ও মহামানবের জীবনে আমরা এর বাস্তবায়ন লক্ষ্য করেছি।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা রাতের অন্ধকারে আটার বস্তা পিঠে নিয়ে ছিন্নমূল মা-শিশুর কুটিরে হাজির হন। শুধু তাই নয়, তিনি বলতেন, ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, তার জন্য আমি উমর (রা.)কে কেয়ামতের দিন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। একজন শাসকের এহেন জনকল্যাণমূলক দায়িত্ববোধ এবং একই সঙ্গে আইনের শাসনের শক্ত বুনিয়াদ অনুসরণ করলে আশা করা যায়, সে দেশে ফরিয়াদি ও বিচারপ্রার্থী তাদের অধিকার ফিরে পাবে। একই সঙ্গে জুলুম-নির্যাতন, শোষণ-বঞ্চনা, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলতা, মারামারি, অপহরণ, ছিনতাই, সন্ত্রাস, হত্যা, চুরি, ডাকাতি সমাজ থেকে বিদূরিত হবে আর মানুষ এ সমাজজীবনে উপভোগ করবে স্বাধীনতা, প্রবৃদ্ধি ও শান্তির অমিয় সুধা। আমাদের সবার উচিত এরূপ একটি সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে আসা।
মূল্যবোধহীন এ সমাজ এক দিনে এ পর্যায়ে আসেনি। কবি গুরু তার ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় সমাজের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন।
“শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’
কহিলাম আমি, ‘তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই-
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই।”
...
“পরে মাস-দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে-
করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।
এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।”
বিগত প্রায় চার দশক অবধি বিচারের আসনে বসে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিচারকার্য ভার নিষ্পন্ন করার যে মিশ্র অভিজ্ঞতা ও মানসিকতার সম্মুখীন হয়েছি তৎপ্রেক্ষিতে বলতে চাই- এ অভিজ্ঞতা খুবই কষ্টদায়ক যাকে আমি আইনের অপর্যাপ্ততা ও অকার্যকারিতার দৃষ্টিতে দেখে আসছি। একেই সবাই আইনের ফাঁকফোকর বলে থাকে।
আদালতে মানুষ ন্যায় বিচার তথা অনিয়মের যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের জন্য আসে কিন্তু বিচারপ্রার্থীগণ যদি প্রতিকার প্রাপ্তির পরিবর্তে হয়রানি, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয় তাহলে বিচারপ্রার্থীর অধিকারহীনতা লাঘব হবে কীভাবে?
আমরা জানি, ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে এ দেশের স্বাধীনতার সূর্য ডুবে যায়। প্রায় ২৫০ বছর আগের সেই ইংরেজ বেনিয়াদের শোষণের উদ্দেশ্য এ দেশে প্রবর্তিত হয়েছিল শাসন ব্যবস্থা। বিগত ২৫০ বছরের আগের সেই পুরনো দেওয়ানি কার্যবিধি আইন ও ফৌজদারি আইনগুলোর যে বিধান ব্রিটিশ সরকার এ দেশে প্রবর্তন করেছিল তা এখনো আমাদের দেশে চলমান। অথচ খোদ ব্রিটিশ সরকার এসব আইন বাতিল করে দিয়ে তাদের দেশে জনস্বার্থে ভিন্ন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন প্রবর্তন করেছে। ইংল্যান্ডের বিচার ব্যবস্থায় জনকল্যাণে প্রবর্তিত আইনে একটি দেওয়ানি মামলা কমবেশি ২৮ দিনে নিষ্পত্তি হয়। অথচ আমাদের দেশে তাদের প্রতর্বিত আইনে একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে দশ, বিশ এমনকি ষাট বছর পেরিয়ে যায়। তিন প্রজন্মেও মামলা নিষ্পত্তি হয় না। ফলে বিচারের নামে হয়রানি ও অবিচারের যে ক্রম পরম্পরা চলে আসছে সে বিষয়ে বিচারক ও আইনজীবীদের তেমন কোনো অস্থিরতা নেই। আর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রত জনপ্রতিনিধিগণ এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় পান না। একটি দেওয়ানি মামলায় আরজি দায়েরের মাধ্যমে মামলা শুরু হয়ে প্রায় ১০/১২টি স্তর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ডিক্রি জারির মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এ স্তরগুলো অতিক্রমে ২০/৩০ বছর সময় অতিক্রান্ত হয়। এরপর শুরু হয় ওই মামলার বিরুদ্ধে আনীত আপিল, রিভিশন ইত্যাদি ইত্যাদি। উচ্চ আদালতের এই স্তর অতিক্রান্তের ক্ষেত্রেও অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষমাণ থাকতে হয় যা অনাকাক্সিক্ষত ও হতাশাজনক। জনপ্রতিনিধি আইন অঙ্গনের দক্ষ অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কেবল একটি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমেই মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতা রোধ করে কম খরচে ও কম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির বিধান করতে পারেন। শুধু প্রয়োজন সৎ উদ্যোগ।
২০২৩ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রিপোর্ট অনুযায়ী বিচার বিভাগে ৪৩ লাখ মামলা বিচারাধীন। উপরন্তু প্রতি বছর আরও কয়েক লাখ নতুন মামলা ওই তালিকাকে করে চলেছে আরও হৃষ্টপুষ্ট। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মামলা নিষ্পত্তির হার এবং নতুন নতুন মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে যে গাণিতিক হার পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে মানুষের বিচার প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার বলতে কিছুই থাকবে না। এক্ষেত্রে মামলা নিষ্পত্তির বিকল্প পদ্ধতিগুলো অনুসরণ, আইনের নতুন নতুন বিধান ও পদ্ধতির প্রবর্তন করা খুবই জরুরি।
‘বিলম্ব বিচার, বিচার না প্রাপ্তির সমতুল্য’, এক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। হয়রানিমুক্ত বিচার প্রাপ্তির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন কম সময়ে, কম খরচে বিচার প্রাপ্তির বিষয়টি। বিগত ৫৩ বছরের বিচার ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি নয় বরং অস্বস্তি, অনাস্থা এবং বিচারালয়ে না আসার মানসিকতা ফুটে উঠেছে। গ্রাম বাংলায় প্রচলিত উক্তি ‘তোর ঘরে মামলা ঢুকুক’- এ বদ-দোয়া ও অভিশাপ দেওয়া হয় দুশমন প্রতিবেশীদের।
আরও লক্ষণীয় মান-সম্মান, অর্থ ও সামাজিক কারণেই অনেক নির্যাতিত মানুষ আদালতের বাইরেই বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করে নেয়। তারা আদালতকে ভয় পায় ও অনিরাপদ মনে করে, এর সংখ্যা বিচারপ্রার্থীদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি বিষয়ে আমরা সবাই অবহিত। জনসাধারণের বিচারহীনতা এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের আকাশ কুসুম বৈসাদৃশ্য বিষয়ে আমাদের কারও মাথাব্যথা নেই।
আমরা জানি কেবল ‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি’- নয় বরং আইনের প্রয়োগহীনতা, নৈতিকতাকে নির্বাসন দিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, ক্ষমতাধরদের দুর্নীতি, লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনের নামে ক্ষমতা দখলের অনাচার আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোকে অকার্যকর করে চলেছে।
নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অনৈতিকতা ও অবক্ষয়ে আজ ‘অনিয়মই’ নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অনৈতিকতা ও ‘জোর যার মুল্লুক তার’- এগুলোই সমাজে এক ধরনের সহনীয়তা পেতে বসেছে। আইন ভঙ্গ করা আজ সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীসহ সারা দেশে শহরগুলোতে রাস্তার দু’পাশে যে বৈদ্যুতিক আলোকবাতি প্রজ্বলিত হয়, কখনো কখনো সন্ধ্যা হওয়ার বহু আগে সেগুলো জ্বালানো হয় এবং পরের দিন বেলা ১০/১১টা পর্যন্ত সেগুলো প্রজ্বলিত থাকে। এর দায়ভার কার? ধর্মীয় উপাসনালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একইভাবে অকারণে বিদ্যুৎ অপচয়ের বিষয়টি সর্বজনবিদিত। আমরা কেউই ট্রাফিক আইন মানতে চাই না। ফলে যা ঘটার তাই ঘটে। মূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ বিনষ্ট হয়। আমরা অবৈধভাবে কাজ আদায়ের লক্ষ্যে ঘুষ প্রদানে সিদ্ধহস্ত। ঘরে-বাইরে নারীদের অসম্মান করা, পরিবেশ বিনষ্ট করা এবং ক্ষতিকারক পলিথিন ব্যবহার কী মারাত্মক অপরাধ তা আমরা জেনেও না জানার ভান করি। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাগুলোকে সিলেবাস থেকে বনবাসে পাঠানো হয়েছে। উল্টো মাদকদ্রব্যের অবাধ প্রবেশ ও ব্যবহার, ছোট-বড় কাউকে সম্মান না করা, অসহায় আর্ত মানুষের সেবায় এগিয়ে না আসা ও অভুক্তদের খাদ্য সহায়তা প্রদান না করা। মা-বাবার প্রতি যত্নশীল না হওয়া। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং সুনাগরিকের কোনো চরিত্র না থাকার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। আমাদের সবার মধ্যে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে অনৈতিকতা ও অপরাধ প্রবণতা শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত বিরাজমান। অথচ এসব নিরোধের জন্য প্রচলিত আইনের আমরা তোয়াক্কা করি না।
দণ্ডবিধি ৩৮৪/৩৮৫ ধারায় এর প্রবিধান আছে। ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদি প্রতিরোধের জন্য ১৬১/১৬২/১৬৩/১৬৪/১৬৫ ও ১৭১ বি ধারা ছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় যথাযথ বিধান প্রবর্তিত হয়েছে। এ ছাড়াও পরিবেশ দূষণসহ ফরমালিন, ভেজাল ইত্যাদির ক্ষেত্রে নানান আইন প্রবর্তিত হয়েছে। দণ্ডবিধির সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে বা সামারি ট্রায়ালে ত্বরিত এসব অপরাধ নিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ এগুলোর যথাযথ আদৌ কোনো প্রয়োগ নেই। মোবাইল কোর্টের নামে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের অলঙ্ঘনীয় নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বিচারের নামে যে অবিচার হচ্ছে সে বিষয়েও আমরা নীরবতা পালন করছি। কীভাবে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে অভিযোগ ও সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়াই একজন ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করা হয়? বিষয়টি সত্যিই চাঞ্চল্যকর। এক্ষেত্রে শুধু মোবাইল কোর্টের বিচার ব্যবস্থা নয়, দেশের সমগ্র বিচার ব্যবস্থার বিষয়ে ২০২৩ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির প্রতিবেদনে শুধু আইনের ফাঁকফোকর নয়, মামলা দীর্ঘসূত্রতা, জন হয়রানি, বিচার পেতে সীমাহীন অর্থ ব্যয়, স্বজনপ্রীতি তথা ঘুষ ও দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে তার একটি চিত্র নিম্নে প্রদর্শন করা হলো।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক বিচারিক সেবা খাতে দুর্নীতির চিত্র-
১. ঘুষ বা নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ দেওয়া ৩৪.১ শতাংশ ক্ষেত্রে
২. অবহেলা ৩১.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে
৩. হয়রানি ৩১ শতাংশ ক্ষেত্রে
৪. প্রতারণা ১৭.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে
৫. স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্বের শিকার ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে
৬. পরিচিত ব্যক্তির সহায়তা গ্রহণে বাধ্য হওয়া ৭.৭ শতাংশের ক্ষেত্রে
৭. রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে
উক্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে সেবাগ্রহীতাগণকে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থ প্রদান করতে হয়েছে :
১. আইনজীবী সহকারীদের ৩৬.৩ শতাংশ ক্ষেত্রে
২. পেশকার ২৩.৭ শতাংশ ক্ষেত্রে
৩. নিয়োগকৃত আইনজীবী ২২.৪ শতাংশ ক্ষেত্রে
৪. দালাল ৪.৬ শতাংশ ক্ষেত্রে
বিচারিক সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে যারা ঘুষ দিয়েছেন তারা ঘুষ প্রদানের কারণ হিসাবে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি উল্লেখ করেছেন :
১. ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না তাই তারা ঘুষ দিয়েছেন ৭৩.৯% ক্ষেত্রে
২. যথাসময়ে সেবা পেতে ঘুষ দিয়েছেন ২৮.৭ % ক্ষেত্রে
৩. নির্ধারিত ফি বা তথ্য জানা না থাকায় ঘুষ দিয়েছেন ১৮.১% ক্ষেত্রে
৪. বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিয়েছেন ৪.৭% ক্ষেত্রে
৫. দ্রুত সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিয়েছেন ৭% ক্ষেত্রে
৬. নির্ধারিত প্রক্রিয়া এড়ানোর জন্য ঘুষ দিয়েছেন ৬.৪% ক্ষেত্রে
৭. সঠিক নথি উপস্থাপনে ব্যর্থতার কারণে ঘুষ দিয়েছেন ৬% ক্ষেত্রে
৮. নির্ধারিত সময়ের আগে বা দ্রুত সেবা পেতে ঘুষ দিয়েছেন ৫.৪% ক্ষেত্রে
উপরে উল্লেখিত তালিকা থেকে দেখা যায় বিচারিক সেবা পেতে যাদের ঘুষ দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে বিচারকদের কথা উল্লেখ নেই। আবার বিচারপ্রার্থীগণ যারা ঘুষ দিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবৈধ সুবিধা লাভ করার উদ্দেশ্যে ঘুষ প্রদান করেছেন। সুতরাং যারা ঘুষ গ্রহণ করছে শুধু তাদের দায়ী করলে চলবে না, যারা ঘুষ প্রদান করেছে অবৈধ সুবিধা লাভের জন্য, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
অর্থাৎ, বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে শুধু বিচারকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনলেই চলবে না। বরং বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অন্য সব অংশীজনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করা প্রয়োজন :
১. প্রতি তিন বছর পর পর সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ এবং তা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা।
২. প্রতি তিন বছর পর পর সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ সুপ্রিম কোর্টের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এবং অধস্তন আদালতের ক্ষেত্রে জেলা আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা।
৩. সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ লিখিতভাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে পৌঁছানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ বাক্স স্থাপন এবং ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ দাখিলের জন্য ডেডিকেটেড ই-মেইল অ্যাড্রেস জনসাধারণকে প্রদান করা।
৪. অধস্তন আদালতে কর্মরত বিচারকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সমন্বয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করা। তদন্ত কমিটি প্রতি ৩ (তিন) মাস পর পর দাখিল হওয়া অভিযোগগুলো পরীক্ষান্তে এবং অভিযুক্তের বক্তব্য শ্রবণপূর্বক তাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রাথমিক নির্ভর সত্যতা আছে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অভিযুক্ত বিচারকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের বা অন্যবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করবেন।
৫. উল্লিখিত তদন্ত কমিটিতে অভিযোগ জানানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টে একটি অভিযোগ বাক্স স্থাপন এবং একটি ডেডিকেটেড ই-মেইল অ্যাড্রেস জনসাধারণকে প্রদান করা।
৬. অধস্তন আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিরীক্ষার জন্য প্রতিটি জজশিপে একজন অতিরিক্ত জেলা জজ, একজন যুগ্ম জেলা জজ ও একজন সিনিয়র সহকারী জজের সমন্বয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা। একইভাবে প্রতিটি ম্যাজিস্ট্রেসিতে একজন এসিজিএম, একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সমন্বয়ে ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা। উক্ত কমিটিতে ‘দুর্নীতি অনুসন্ধান ও প্রতিরোধ কমিটি নামে অভিহিত করা যেতে পারে। আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দাখিলকৃত সব অভিযোগ উক্ত কমিটি পর্যালোচনা করবে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে।
৭. অধস্তন আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দাখিলের জন্য প্রতিটি জজশিপ ও ম্যাজিস্ট্রেসিতে একটি অভিযোগ বাক্স স্থাপন করতে হবে এবং ই-মেইলের মাধ্যমে দুর্নীতির শিকার ব্যক্তি যেন তাঁর অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য জনসাধারণকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটি ডেডিকেটেড ই-মেইল অ্যাড্রেস (যা প্রতিটি জজশিপ ও ম্যাজিস্ট্রেসির জন্য আলাদা হবে) প্রেরণ করতে হবে।
৮. অধস্তন আদালতের সহায়ক বিচারক-কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য গঠিত কমিটিকে প্রতি ৩ (তিন) মাস পর পর হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির কাছে তাদের সম্পদ ও কাজের বিবরণসংবলিত প্রতিবেদন প্রেরণ করতে হবে।
৯. আইনজীবীগণের দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি জেলায় পৃথক পৃথক অভিযোগ গ্রহণ ও তা নিষ্পত্তির জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
বিচার বিভাগে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর ঐক্য এবং বার ও বেঞ্চের মধ্যে সমন্বয়। আদালতের যে সহায়ক কর্মকর্তা বা কর্মচারী ঘুষ দাবি বা গ্রহণ করে তাঁর বিষয়ে আইনজীবীগণ ওয়াকিবহাল থাকলেও নানা কারণে তাঁরা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দাখিল করেন না। আবার ঘুষ দিয়ে দ্রুত কাজ আদায় করার জন্য যারা সব সময় থাকেন সেরূপ আইনজীবী বা আইনজীবী সহকারীর বিষয়ে বার কাউন্সিলকেও যথাসময়ে অবহিত করা হয় না। ফলে দুর্নীতির বিষয়টি অনেক সময় ধামাচাপা পড়ে যায়। এ কারণে দুর্নীতি প্রতিরোধে উপরে বর্ণিত প্রতিটি কমিটি গঠনপূর্বক তাদের শক্তিশালী করতে হবে এবং জনসাধারণকে এসব কমিটির অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যেন ভুক্তভোগীরা যথাস্থানে তাদের অভিযোগ জানাতে পারেন।
আমাদের দেশের গণমানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যায়ে পড়ে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ওই সময় মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ভুটানসহ পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনৈতিক অবক্ষয় বাংলাদেশের চেয়ে অনেক নিম্নমানের ছিল; কিন্তু বিগত ৫৩ বছরে মালয়েশিয়াসহ একাধিক দেশ তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মান-মর্যাদা অনেক উচ্চস্তরে প্রতিস্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। আগেই উল্লেখ করা হয়- যে দেশে আইনের শাসন নেই সে দেশে গণতন্ত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ দেশে একটি হত্যা মামলার বিচার হতে গড়ে ২০/২৫ বছর সময় লাগে। একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে ২০/৩০ বছর সময় অতিক্রান্ত হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীগণ মিল-ফ্যাক্টরি তৈরি করে পরবর্তীতে আইনগত অপর্যাপ্ততা, জটিলতা ও বিচারহীনতার কারণে সবকিছু ফেলে দেশ ত্যাগ করে। এর ফলে বিনিয়োগ হারিয়ে দেশ প্রবৃদ্ধিহীন হয়ে পড়েছে। এ দেশে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়ে ও লালন-পালনে সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে অবাধে। সব সরকারি অফিস ও আদালতে স্পিড মানি, ঘুষ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমাহীন দুর্নীতির কারণে মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জনে জনগণ বার বার হোঁচট খাচ্ছে। নৈতিকতাহীন অশ্লীল কার্যক্রম মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে চলেছে। মানুষ গড়ার কারিগর খ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপিত হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের কোনো আস্থা নেই। সর্বোপরি বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে চলেছে। অবাঞ্ছিত এসব ঘটনা ঘটে চলেছে রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটির ত্রুটি-বিচ্যুতিজনিত কারণে। আর এগুলোকেই আইনের ফাঁকফোকর হিসেবে সহনীয় করে নিয়ে আমরা প্রত্যেকেই পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছি। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। রাজা-বাদশা, শাসক-শাসিত, ধনী-গরিব, আপন-পর এবং সব ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কারও জন্য আইন প্রয়োগে কোনো তারতম্য করা উচিত হবে না। বরং দেশ পরিচালনার মূলনীতি হবে- ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন’। শাসক শ্রেণি, বিচারিক ও আইন প্রণয়নকারী ব্যক্তিবর্গকে সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থ ও জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে। নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত করতে হবে। তাহলেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের পথে সব বাধা-বিপত্তি ও জঞ্জাল অপসারিত হবে আর গড়ে উঠবে একটি স্বপ্নের সোনার বাংলা।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ