বগুড়ায় বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর প্রেম যমুনা ঘাট হতে পারে রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত। সরকারিভাবে সংস্কার করে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে দিলেই প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব। বিনোদন কেন্দ্র বঞ্চিত বগুড়ার সহস্র পরিবার প্রতিদিন এই প্রেম যমুনা ঘাটে ভিড় করেন। পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের জন্য কোন সুযোগ সুবিধা না থাকার পরেও হাজারো মানুষের প্রতিদিন ভিড় হয় এখানে। তাই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে দেশের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি হয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আর সরকারিভাবে ভালো কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করায় শ্রীহীন পড়ছে বগুড়ার যমুনা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা ১০টি পর্যটন কেন্দ্র।
জানা গেছে, বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলাটি যমুনা নদী দিয়ে ঘেরা। দেশের সবচেয়ে বৈচিত্রপূর্ণ এই নদীই এলাকার মানুষের জন্য কখনো সুখের কখনো দুঃখের সঙ্গী হয়ে থাকে। তবে হিসাব কষে দেখলে প্রায় দুই মাস বন্যায় দুর্ভোগের পর থেকে বাকি ১০ মাস এলাকাবাসির উপকারেই লেগে থাকে। ধান কাটে, ফসল ফলায়, বর্ষায় মাছ আহরণ করে নদীবাসী দিন পার করে। এর সঙ্গে নদী শাসন করতে গিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ফিস পাস, স্পার, গ্রোয়েনগুলো নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকৃত বিভন্ন বাঁধগুলোই এখন পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। নদী কেন্দ্রীক বিনোদন উপভোগ করতে প্রতিদিন শতশত পরিবার যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভিড় করছে। অনেক পরিবার নদী পারে বসে সময় পার করছে। কেউ যাচ্ছে পিকনিকে, কেউ নৌ ভ্রমণে, কেউ বা চরে চরে ঘুরতে, জল ও বৃক্ষের সাথে একলা বসে সময় পার করতে, বট বৃক্ষের ছায়ায় উদাস হতে, কেউ মাছ শিকারে, কেউ বা কাশফুলের টানে দিন পার করছে বগুড়ার যমুনা নদীর বক্ষে। এই নদীর পাড়ে বসে বা দাঁড়িয়ে থেকেই দেখা যায় সূর্য অস্ত যাওয়ার নয়নাভিরাম দৃশ্য। বিকেলের পাখিদের সাথে সূর্যটাও যেন টুপ করে ফিরে যাচ্ছে ঘরে। এসব দৃশ্য দেখতে বগুড়া, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলার অনেক ভ্রমণ পিপাসু ভিড় করছেন প্রতিদিন। এর সঙ্গে বগুড়ার শতশত পরিবার যাচ্ছেন এই প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো উপভোগ করতে। জীব-বৈচিত্রের নানা উপাদান আর খেলা নিয়ে মত্ত থাকা যমুনা নদীর বিভিন্ন স্পটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় প্রেম যমুনা ঘাটে, এর সঙ্গে কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধে, দেবডাঙ্গা ঘাটে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে, হাসনাপাড়া হার্ডপয়েন্ট, দিঘলকান্দি, কুতুবপুর, শিমুলতলা ফিসপাস, নিজবলাইল ঘাট ও স্পারগুলো খুব দৃষ্টি নন্দন। এরসঙ্গে অর্ধশত চরের মধ্যে ধারাবর্ষা, শনপোচা, নাটুয়ারচর, ডাকাতমারা চরগুলো প্রাকৃতিক নৈসর্গে ভরা। চারপাশে যমুনা নদীর পানি আর একদিকে দ্বীপের মত ভেসে থাকা চর। মাঝে মাঝে ভোলার সেই বিখ্যাত মনপুরা চরের কথা কিম্বা সেন্টমার্টিন এর মত মিনি অনুভূতি পাওয়া যায়। এসব নদী কেন্দ্রীক স্পটগুলো দেখতে মানুষের ভিড় পড়ে যায়। বিশেষ করে দুই ঈদ, বর্ষাকালে, শরৎকালে, বসন্তকালে এবং বিশেষ বা ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকে না। এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন এলাকার অসহায় ও বেকার যুবকরা। তবে এই উপজেলার কালিতলা ঘাট এবং প্রেম যমুনা ঘাটকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা সরকারিভাবে সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করলে রাজস্ব আয় করতে পারবে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কালিতলা গ্রোয়েন এলাকার ব্যবসায়ী মোঃ মতি জানান, যমুনা নদীতে প্রতি বছর হাজার পর্যটক আসেন বেড়াতে। বিভিন্ন হার্ডপয়েন্টগুলোতে ঈদ ছাড়াও সরকারি ছুটির দিন, জাতীয় দিবসগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। এখানে শতাধিক ব্যবসায়ি এই ভ্রমণ পিপাসুদের কারণে এখন ভালোভাবে দিন পার করছে। তিনি জানান, যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই গ্রামীণ জনপদের পাশাপাশি খুব কাছে থেকে নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করার অন্যতম দর্শনীয় স্থান বগুড়ার সারিয়াকান্দি কালিতলা ঘাট। এখানে বর্ষা মৌসুমে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে দর্শনার্থীদের ভিড় জমতে শুরু করে। বছরে ছয়টি ঋতুর তুলনায় বর্ষা ও শরৎকালে দর্শনার্থীদের আনাগোনা বেশি হয়।
বগুড়ার মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জানান, ঈদের ছুটি বেশি থাকায় এবার দর্শনার্থীদের চাপ বেড়েছে। এজন্য ঈদের দিন থেকে মহাস্থান জাদুঘর ছাড়া সবগুলো প্রত্নসাইট খোলা রাখা হয়েছে। ঈদের পরদিন থেকে জাদুঘর খোলা হয়। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়। নিজস্ব আনসার বাহিনী রয়েছে।
বিনোদনকেন্দ্রে কোনোরকম অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়েছে। আর সরকারিভাবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে অবগত করা হবে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন রঞ্জন সরকার জানান, ঈদে লম্বা ছুটির কারণে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় বেড়েছে। বিনোদন কেন্দ্রে আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। পাশাপাশি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে সেদিকেও নজরদারি রয়েছে।