শিলংয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের পর মিক্সড জোনে এলেন হামজা দেওয়ান চৌধুরী। মুখে বিস্তৃত হাসি। সাংবাদিকদের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এলেন। হাত মেলালেন অনেকের সঙ্গে। জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষিক্ত হয়ে নজরকাড়া ফুটবল খেলেন। অভিনন্দন গ্রহণ করেন বিনয়ের সঙ্গে। গতকাল ম্যাচ ছিল হামজাময়। ঠিক তেমনি সংবাদ সম্মেলন এবং মিক্সড জোনও ছিল হামজাময়।
কোচ হাভিয়ের কাবরেরা হাসেন খুবই কম। গম্ভীর থাকেন বেশিরভাগ সময়। নিজের মনে ভাবতে থাকেন ফুটবল নিয়ে। গতকাল তিনি হাসলেন। হামজা চৌধুরীকে কেমন দেখলেন? প্রশ্ন শুনেই বললেন, ‘হামজা আমাদের দলের সবাইকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে। আত্মবিশ্বাসী করেছে। সাহস জুগিয়েছে। তার খেলায় আমরা সবাই খুবই আনন্দিত। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে যেভাবে ম্যাচটা ধরতে পেরেছে তা ছিল অসাধারণ। প্রয়োজনে সে নিচে নেমে খেলেছে। ডিফেন্ডারের কাজ করেছে। তার অ্যাটাকিং এবং সেটপিসগুলোও ছিল অসাধারণ।’ হামজা সম্পর্কে নিজের প্রথম মূল্যায়নটা এভাবেই করলেন কাবরেরা। তবে হামজা যে মানের ফুটবলার তা তিনি পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেননি। কোচ বললেন, ‘লিস্টার সিটি কিংবা শেফিল্ডের হয়ে হামজা যেমন এখানে ততটা আমরা পাইনি। তবে সামনের ম্যাচে নিশ্চয়ই সেই চিরচেনা হামজাকে পাব আমরা।’ পুরোপুরি না পেলেও তো হামজায় মুগ্ধ সবাই। এমনকি প্রতিপক্ষ ভারতের কোচও। তিনি তো সংবাদ সম্মেলনে এসেই আত্মসমর্পণ করেছেন। ‘আমরা খুবই ভাগ্যবান যে গোল হজম করতে হয়নি।’ হামজা এতটাই দুরন্ত খেলেছেন, প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকরা তাদের দল বাদ দিয়ে ছুটতে শুরু করেছিল তাকে বহন করা গাড়ির পেছন পেছন।
হামজা কী বলেছেন? মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত বাংলাদেশের হয়ে ম্যাচটা খেলতে পেরে।’ আর সতীর্থদের কীভাবে মূল্যায়ন করলেন? ‘ওরা সত্যিই খুবই ভালো ফুটবলার। দক্ষতা আছে।’ এই সতীর্থদের নিয়েই কি এশিয়ান কাপ খেলার স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব? কোচ হাভিয়ের কাবরেরা বলেন, ‘আমরা নিঃসন্দেহে হামজাকে পেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছি। কয়েক ধাপ এগিয়েছি। তবে আমাদের অনেক সতর্ক থাকতে হবে। আরও বেশি শক্তি অর্জন করতে হবে। আমাদের গ্রুপে দুটো ম্যাচই আজ ড্র হয়েছে (সিঙ্গাপুর-হংকং গোলশূন্য ড্র)। সবাই পয়েন্ট হারিয়েছে। এই গ্রুপে যারা কম পয়েন্ট হারাবে তারাই খেলবে এশিয়ান কাপ।’ গ্রুপ থেকে একটা দল খেলবে চূড়ান্ত পর্বে। সামনের ম্যাচগুলোও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
গতকাল শিলংয়ে সুনীল ছেত্রী বনাম হামজা চৌধুরীর লড়াই দেখতে চেয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু সেই লড়াইয়ে সুনীল ছেত্রী পুরোপুরিই হেরে গেছেন। শেষদিকে তো তাকে উঠিয়েই নিলেন কোচ মানোলো মারকুয়েজ। ‘সুনীল টোটকা’তেও কাজ হয়নি ভারতের। বরং কোচ মানোলো বলেই দিলেন, ‘আমরা বাজে একটা ম্যাচ খেলেছি।’ মাথা নিচু করে আত্মসমর্পণ করলেন তিনি।
বাংলাদেশ ছাড়ার আগে হামজাকে নিয়ে দলের প্রায় সবাই বলেছিলেন, জয় চাই। অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া অবশ্য ম্যাচের আগের দিন বলে দেন, জয় তো চাই। তবে অন্তত ড্র হলেও চলে। ভারতের মাটি থেকে একটা পয়েন্ট নিয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ করতে পারেন জামাল-হামজারা। অবশ্য সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হবে। ১০ জুন সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে হোম ম্যাচ খেলবেন জামালরা। পরের ম্যাচ অক্টোবরে, প্রতিপক্ষ হংকং। এরপরই ভারত আসবে বাংলাদেশে। ততদিনে হামজার সঙ্গে দলের অন্যদের বোঝাপড়াটা আরও বাড়বে। তিনি এক ম্যাচ খেলেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলের প্রয়োজনে ডিফেন্ডার হতে পারেন। হতে পারেন মিডফিল্ডার। এমনকি ফরোয়ার্ড লাইনেও নিজের দক্ষতা দেখাতে পারেন। কেবল হামজাই নন, গতকাল আরও একজন দুর্দান্ত খেলেছেন। তিনি মিতুল মারমা। কোচ কাবরেরার কণ্ঠেও তার প্রশংসা ঝরে পড়ল, ‘মিতুল আমাদের দলে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।’
কোচ কাবরেরার হাসি গতকাল আরও একটু লম্বা হতে পারত। অন্তত পাঁচটা গোলের সুযোগ তো পেয়েছে বাংলাদেশ। গোল কেন হলো না। কাবরেরার সোজাসাপ্টা জবাব, ‘আমাদের ভালো ফরোয়ার্ড নেই।’ তাহলে উপায়? ভালো মানের ফরোয়ার্ড খুঁজে বের করতে হবে। যেভাবেই হোক তা করতেই হবে। নাহলে এভাবেই সুযোগ পেয়েও বার বার ব্যর্থ হবে লাল-সবুজের জার্সিধারীরা।