দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন চায় ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। আর ডিসেম্বরের মধ্যে নিবার্চন চায় ২৬ শতাংশ মানুষ। সে হিসাবে চলতি বছরের মধ্যেই নির্বাচন চায় ৫৮ দশমিক ১৭ শতাংশ ভোটার। একইভাবে ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। এই ইস্যুকে সমর্থন দিয়েছেন ৭১ শতাংশ মানুষ। একই সঙ্গে জরিপে অংশ নেওয়া জনগণ সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জানিয়েছেন বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট বিষয়ে। আর ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে সবচেয়ে প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের নির্বাচনি দৃষ্টিভঙ্গি, তারা কবে নির্বাচন চান, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা, তারা কাকে ভোট দিতে চান এবং ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষগুলোকে তারা গুরুত্ব দেন- এমন বিভিন্ন বিষয় জানতে চেয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপটি পরিচালিত হয়েছে ‘ইনোভিশন বাংলাদেশ’ নামে একটি গবেষণা সংস্থার উদ্যোগে। এ জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ১০ হাজার ৬৯০ জন অংশ নেন। যার ফলাফল গতকাল রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। জরিপ কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছে ব্রেইন ও ভয়েস ফল রিফর্ম নামের অন্য দুটি সংস্থা। সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ইনোভিশন কনসালটিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ স্পিকস-এর প্রধান মো. রুবাইয়াৎ সারওয়ার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইনোভিশন কনসালটিং বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর কাজী শাহেদ এইচ ফেরদৌস, ইনোভিশনের প্র্যাকটিস এরিয়া লিড আবদুর রব ও বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর। জরিফের ফলাফলে জানানো হয়, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোটার ২০২৫ সালের মধ্যেই নির্বাচন চান। তাদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার জুনের মধ্যে এবং ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার ডিসেম্বরে নির্বাচন হওয়ার পক্ষে। ১০ দশমিক ৯ শতাংশ ডিসেম্বরের পর নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
জরিপের তথ্যানুযায়ী, দল হিসেবে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে ৪১ শতাংশ মানুষ। জামায়াতে ইসলামীকে চায় ৩১ শতাংশ ভোটার। সবচেয়ে কম সংখ্যক জনসমর্থন ছাত্রসমর্থিত পার্টিকে। মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ চায় ছাত্রদের দ্বারা গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টিকে। এ ছাড়া এখনো ১৪ শতাংশ মানুষ চায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে। ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে প্রত্যাশা হিসেবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ চান ৭১ শতাংশ মানুষ। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তারা কাকে ভোট দেবেন। এর মধ্যে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ তাদের পছন্দের দলের কথা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দল হলো বিএনপি (৪১ দশমিক ৭ শতাংশ)। এর পরের অবস্থানগুলোতে আছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (৩১ দশমিক ৬ শতাংশ), আওয়ামী লীগ (১৪ শতাংশ), নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি (৫ দশমিক ১ শতাংশ) এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল (৭ দশমিক ৬ শতাংশ)। জরিপ অনুসারে, ভোটারদের মধ্যে একটি প্রজন্মগত পার্থক্য রয়েছে। জেনারেশন এক্স (Generation X) এবং বুমারদের (Boomers) মধ্যে বিএনপির প্রতি সমর্থন তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে জেনারেশন জেড (Generation Z)-এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত প্রায় সমান জনপ্রিয়।
অনিশ্চিত ভোটার ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ : জরিপ অনুযায়ী, ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি যে তারা কাকে ভোট দেবেন। তাদের মধ্যে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ বলছেন যে তারা প্রার্থী সম্পর্কে জানার পর সিদ্ধান্ত নেবেন। আর ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চান। এক্ষেত্রে নারী ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেশি (৩৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ)। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। সারা দেশে ৮টি বিভাগের ৬৪ জেলার ১০ হাজার ৬৯৬ জন এই জরিপে অংশ নেন। গ্রামীণ এলাকার ৭১ শতাংশ এবং শহরের ২৯ শতাংশ মানুষ এতে অংশ নেন। জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৫ শতাংশ নারী। জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ জেনজির অংশ। ২৯-৪৪ বছর বয়সি ৩৪ শতাংশ, জেন এক্স ৪৫-৬০ বছর বয়সি ১৮ শতাংশ, ৬০ এর বেশি ১২ শতাংশ। বিভাগওয়ারী হিসেবে জরিপে অংশ নেন ঢাকা বিভাগের ২৬ শতাংশ, চট্টগ্রামের ১৯ শতাংশ, রাজশাহীর ১৩ শতাংশ, খুলনা বিভাগের ১২ শতাংশ, রংপুর বিভাগের ১১ শতাংশ, ময়মনসিংহের ৭ শতাংশ, বরিশালের ৬ শতাংশ এবং সিলেট বিভাগের ৬ শতাংশ মানুষ এতে অংশ নেন। সব দলের জনসমর্থন শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি বলে জরিপে উঠে এসেছে। তবে নারী-পুরুষের মধ্যে দলীয় সমর্থনে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। জরিপে আরও জানানো হয়, রংপুর ও খুলনা বিভাগে সবচেয়ে বেশি জনসমর্থন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে সবচেয়ে বেশি জনসমর্থন বিএনপির।
জরিপের ফলাফল অনুসারে, তীব্র অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক সংকটকে উদ্বেগের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এই জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তারা যে প্রত্যাশা রাখেন, তার মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ ৬৯ দশমিক ৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন (৪৫ দশমিক ২ শতাংশ) এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি (২৯ দশমিক ১ শতাংশ) ছিল অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। সরকারি সেবায় দুর্নীতি কমানোর প্রত্যাশা করেছেন ২১ দশমিক ৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। তাদের ভিতর ২ দশমিক ৬২ শতাংশ মনে করেন যে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ৪২ দশমিক ৩৩% মনে করেন এটি আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। আর ৫৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ মনে করেন এটি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।