বয়সের অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের উদ্দীপনার সমন্বয়ে দারুণ কিছু হতে পারে। হোক সেটা সমাজ বিনির্মাণে কিংবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়। এ রকম সফল উদাহরণ অনেক দেখেছি। এই যেমন ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাচিনা গ্রামে দেখা মিলল চমৎকার এক উদ্যোগের। চার স্বপ্নবান তরুণ এবং তিনজন অভিজ্ঞ কৃষক এক হয়ে গড়ে তুলেছেন সমন্বিত খামার। তিনজন অভিজ্ঞ কৃষকের দীর্ঘদিনের কৃষি অভিজ্ঞতা আর চার তরুণের প্রযুক্তির দক্ষতা মিলিয়ে গড়ে তোলা সফল এ কৃষি উদ্যোগ অনেকের কাছেই এখন সাফল্যের উদাহরণ। কাচিনা গ্রামে বিশ একর জমিতে মাল্টা, লেবু ও মাছ চাষের প্রকল্প তাঁদের। ‘শুরুটা ২০১৭ সালে। কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চার বন্ধু প্রযুক্তি নিয়ে কাজকর্ম করতে করতে ভাবলাম প্রকৃতি কাছাকাছি থেকে কম সময় বিনিয়োগ করে হালাল অথচ সচ্ছল জীবনধারণের জন্য উপার্জনের খাত কী হতে পারে। ইউটিউবে আপনার কৃষিবিষয়ক প্রতিবেদনগুলো আমাদের চোখ খুলে দিল। উচ্চমূল্যের ফল-ফসল চাষ হতে পারে দারুণ কিছু। কিন্তু আমাদের কৃষির অভিজ্ঞতা নেই। আছে অদম্য ইচ্ছা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান।’ বলছিলেন চার তরুণের একজন শরিফুল ইসলাম। তিনি তাঁর খামারে একটি ল্যাপটপে কাজ করতে করতে কথা বলছিলেন আমার সঙ্গে। শরিফুলের বয়স ত্রিশের কোঠায় হবে। বুদ্ধিদীপ্ত চোখজুড়ে স্বপ্ন খেলছে।
অভিজ্ঞ কৃষক সামছুল হক সুরুজ। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তিনি এই উদ্যোগের একজন সদস্য। তরুণ উদ্যোক্তাদের তারুণ্যের ছটায় যেন উজ্জ্বল হয়ে আছেন তিনি। ‘কৃষিকাজ করে আসছি অনেক বছর। কিন্তু চাষ তো করছি ধান, পাট, গম, আখ ইত্যাদি। মাল্টা-কমলা তো চাষ করিনি। এই চাষাবাদও আমাদের কাছে নতুন। ওরা কম্পিউটারে আপনার ভিডিও দেখাল। চুয়াডাঙ্গায় দামুড়হুদার শাখাওয়াত হোসেনের মাল্টা বাগানের। সেখানে গেলাম আমরা। কথা বললাম বাবুলের সঙ্গে। তিনি আমাদের পরামর্শ দিলেন। কৃষির সঙ্গে অনেক দিনের বোঝাপড়ায় মাটির ভাষা বুঝতে খুব একটা কঠিন লাগল না। কথায় বলে না, দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ, আল্লাহ ভরসা! নেমে পড়লাম। তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নতুন কিছু করার আনন্দ পাচ্ছিলাম।’ হাসি মুখে বলছিলেন সামছুল হক সুরুজ। আট একরের বিশাল মাল্টাবাগান ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। মাশাল্লাহ প্রতিটি গাছ ফলে ফলে ভরা। সামছুল হক সুরুজ বলছিলেন বাগান শুরুর কথা। ‘শাখাওয়াত হোসেন বাবুলের কাছ থেকে ফিরে ১৭০০ মাল্টা চারা কিনে শুরু করলাম মাল্টা চাষ। সরকারের কৃষি বিভাগ তাদের এক প্রকল্প থেকে দিল ১২০টি চারা আর দিকনির্দেশনা। কিছুদিন পর জমিতে সরকারের কৃষি বিভাগ তাদের প্রকল্প থেকে ৩০০ চারা দিল। আমরা আরও ২৩০টি চারা কিনে এক একর জমিতে বাগান বাড়ালাম। মোট মাল্টা গাছ হলো ২ হাজার ৩৫০টি। প্রথম বছরেই ফলন এলো। তিন টনের মতো ফল বিক্রি করলাম। প্রথম বছর ফলন কম আসে। অপেক্ষা করছিলাম দ্বিতীয় বছরের। মাশাল্লাহ বাম্পার ফলন হলো। আমরা বাগান থেকে ১৮ টন ফল বিক্রি করলাম। সব খরচ শেষে পনেরো লাখ টাকা লাভ থাকল।’ লাভের কথায় উজ্জ্বল প্রভা ছড়িয়ে পড়ছিল সামছুল হক সুরুজের চোখমুখে। জানতে চাইলাম, ‘কৃষিতে এমন লাভ আগে কি কখনো ভেবেছিলেন?’
বললেন, ‘নাহ। এমন লাভ দেখিনি। এই জমিতেই ২০০-৩০০ মণ আখ চাষ করছি একসময়। কিন্তু এত টাকা পাইনি। এখন ১০ গুণ বেশি আয়।’
প্রশ্ন করলাম, আগের কৃষিতে লাভ কম হওয়ার কারণ কী ছিল?
সুরুজ বললেন, ‘শ্রমিকের মজুরি বেশি দিতে হয়। এখন তো মজুর পাওয়াই যায় না। তারপর কীটনাশকের পেছনে চলে যায় লাখ লাখ টাকা। ধরেন এই বাগানে কোনো কীটনাশক দিই না। সেক্স ফেরোমেন্ট ট্র্যাপ ব্যবহার করি। প্রথমে ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল। এখন বছরে খরচ হয় মাত্র ৫ হাজার টাকা। অথচ কীটনাশক ব্যবহার করলে লাখ টাকা খরচ হতো।’
তিন বছরের অভিজ্ঞতায় দারুণ এক জায়গায় এসে পৌঁছেছেন তাঁরা। বাগানে সাতজন উদ্যোক্তার চারজন উপস্থিত ছিলেন। সাধারণত পালাক্রমে বাগানে উপস্থিত থাকেন সবাই। আবার কখনো কখনো একসঙ্গেও খামারে থাকেন। কারণ এই খামারটিই তাঁদের স্বপ্নের জায়গা। যাঁরা প্রযুক্তি নিয়ে শহরে কাজ করছেন তাঁরাও সময় করে ফলন মৌসুমে সুযোগ করে একসঙ্গে খামারে আসেন। ফলে ফলে ভরা মাল্টাবাগানের মাঝে ছাউনি ঘরে বসে উপস্থিত চার উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
এখন কৃষি যতটা বাণিজ্যিক, ততটাই প্রযুক্তিনির্ভর। বলা যায় প্রযুক্তিই এমন উদ্যোক্তাদের মূল আকর্ষণের জায়গা। প্রত্যন্ত গ্রামের এই মাল্টাবাগানে বসে তাঁরা ভবিষ্যতের কৃষি নিয়ে অসাধারণ স্বপ রচনা করে চলেছেন। এই কৃষিখামারের আরেকজন উদ্যোক্তা হলেন তরুণ প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল। আইটি বিষয়ে ভালো চাকরির সুযোগ থেকেও তিনি গ্রামে থেকে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর কাছে গতানুগতিক কৃষি নয় সময়োপযোগী আধুনিক কৃষিখামার গড়াই মূল লক্ষ্য। বিশ্বের সর্বাধুনিক উচ্চফলনশীল ফসলের সবই উৎপাদনে আনতে চান তিনি। তিনি বললেন, ‘বর্তমানে অর্গানিক কৃষিপণ্যের একটা বিশাল বাজার তৈরি হচ্ছে সারা বিশ্বে। তাই আমরাও সিদ্ধান্ত নিয়েছি অর্গানিকভাবে চাষাবাদ করার। প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পোকামাকড় দমন থেকে ফলন বৃদ্ধির জন্য রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই।’
মাল্টার মৌসুমে যদিও স্থানীয় মাল্টার দাম আমদানি মাল্টার চেয়ে অর্ধেক থাকে, তারপরও উৎপাদন খরচের হিসেবে বর্তমান বাজারমূল্যে অসন্তুষ্ট নন তাঁরা। উৎপাদিত পণ্যের মূল্য এবং বাজারনীতি ও কৌশল নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন শরিফুল ইসলাম। তিনি জানালেন, অনলাইনে বেচা-বিক্রি হয়ে যায় অধিক। তবে কিছু সমস্যার কথাও জানালেন। অনলাইনে অনেকেই ৫-১০ কেজি মাল্টার অর্ডার করেন। কিন্তু অল্পসংখ্যক মাল্টা ডেলিভারি করার সুযোগ থাকে না। যেমনটা আমের মৌসুমে হয়। আমের ডেলিভারি দেওয়ার জন্য অনেক কুরিয়ার সার্ভিস পাওয়া যায়। মাল্টা বা অন্য ফল-ফসল ডেলিভারি দেওয়ার জন্য সারা বছর কোনো সার্ভিস পাওয়া গেলে তাদের জন্য ভালো হতো। শরিফুলের কথায় আরেক সম্ভাবনার কথা মনে হলো। কৃষি ও কৃষিপণ্যকে ঘিরে নতুন নতুন সব উদ্যোক্তা বের হয়ে আসার এক ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ব্যাপারটা আশাজাগানিয়া। যা হোক, গাছে গাছে মাল্টার বিস্ময়কর ফলনে খুশি উদ্যোক্তারা। বাগান থেকেই গত বছর মাল্টা বিক্রি করেছেন প্রায় ৪৩ লাখ টাকার। এবার চতুর্থ বছরে এসেও কমপক্ষে ৪০ থেকে ৫০ টন মাল্টার আশা করছেন। যেখান থেকে এবারও ভালো লাভ ঘরে আসবে বলে ধারণা তাঁদের।
এই এলাকায় আগেও কৃষিকাজ করেছেন মজিবর রহমান। এই উদ্যোগের অপর সদস্য। তিনি মনে করেন, এখানকার এই সমন্বিত উদ্যোগ আর আগেকার কৃষির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। তরুণদের সান্নিধ্যে নতুন নতুন ফল ফসল উৎপাদনের মধ্যে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন তিনি। কৃষিকেও তিনি যেন নতুন করে পেয়েছেন, নতুন করে দেখছেন সবকিছু। সাহস করে উদ্যোগ নেওয়াটাই বড় কথা। তারপর নিষ্ঠার সঙ্গে সেটি ধরে রাখলে একদিন সাফল্যের পথ পাওয়া যায়। আজকের দিনে তরুণ উদ্যোক্তাদের সফল কৃষি প্রকল্পগুলো এর প্রমাণ রাখছে। ভালুকার কাচিনা গ্রামে যে কৃষিসাফল্য দেখে এসেছি তা শিক্ষিত তরুণদের কর্মপ্রয়াসের একটি দৃষ্টান্ত। এর সঙ্গে দিনে দিনে অনেক কৃষকই যুক্ত হচ্ছেন। প্রযুক্তিনির্ভর ও জৈব কৃষি অনুশীলনের সাফল্যজনক দিকগুলো তাঁদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি আমাদের সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব