বিডিআর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সত্য উদঘাটনে কমিশন ‘সুশৃঙ্খল’ পদ্ধতিতে কাজ করছে। এ কথা জানিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এএলএম ফজলুর রহমান।
অন্তর্বর্তী সরকার তৎকালীন আধাসামরিক বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)-এর সদর দপ্তরের অভ্যন্তরে ২০০৯ সালের হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তে ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ গঠন করেছে। এর লক্ষ্য হত্যাকাণ্ডের পেছনের সত্য উদঘাটন করা।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘১৬ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার সত্য উদঘাটন করা জটিল কাজ, তবে কমিশন ‘সুশৃঙ্খল’ পদ্ধতিতে এগিয়ে যাচ্ছে’।
বিডিআর বিদ্রোহের বেশ কয়েকবছর আগে আধাসামরিক সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত এ জেনারেল আরো বলেন, কমিশন রক্তাক্ত সেই বিদ্রোহের পাঁচটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপর দৃষ্টি রেখে যাবতীয় প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের জন্য কাজ করছে।
তিনি বলেন, প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ধরন উদঘাটন, বিডিআর-এ ডেপুটেশনে কর্মরত ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যায় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত এ ঘটনার প্রকৃত অপরাধী, সহযোগী, ষড়যন্ত্রকারী, প্রমাণ ধ্বংসকারী এবং উস্কানিদাতাদের চিহ্নিতকরণ।
ফজলুর রহমান বলেন, কমিশন ঘটনার সাথে সম্পর্কিত সম্ভাব্য দেশি-বিদেশি উভয় কারণই খতিয়ে দেখবে এবং এ হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করবে।
তিনি আরো বলেন, ‘কমিশনকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তার কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এ পর্যন্ত আমরা ৪১ কার্যদিবসে ৩৭ জনের সাক্ষ্য রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছি’।
পুনঃতদন্ত প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কমিশনের সামনে এখন পর্যন্ত যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, তিনজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল, দু’জন মেজর জেনারেল, পাঁচজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, চারজন কর্নেল, চারজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল, সাতজন মেজর, দু’জন ক্যাপ্টেন, সাতজন বিডিআর সৈনিক এবং বিদ্রোহে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের তিনজন সদস্য।
গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর একজন পুলিশ সদস্য ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপকসহ সাবেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে এ স্বাধীন কমিশন গঠন করা হয়।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা আমাদের কাজ শেষ করার আশা করছি, তবে প্রয়োজন হলে আমরা হয়তো আরও কিছু অতিরিক্ত সময় নিতে পারি’।
উল্লেখ্য, বিদ্রোহের পরপরই আধাসামরিক বাহিনী বিডিআর-এর ব্যাপক পুনর্গঠন করা হয়। পোশাক এবং লোগো পরিবর্তনসহ বিডিআর-এর নাম পাল্টে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’ রাখা হয়।
আগের তদন্তে বিদ্যমান দণ্ডবিধি আইনের অধীনে বিশেষ দায়রা আদালতে বেশ কয়েকজন সাবেক বিডিআর কর্মীর বিচার করা হয়েছিল এবং সীমান্ত বাহিনীর জন্য প্রযোজ্য তৎকালীন আইন অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে ছোটখাটো অপরাধীদের বিচার বিডিআর আদালতে করা হয়েছিল।
ফজলুর রহমান বলেন, কমিশন তার কাজের অংশ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান (অবসরপ্রাপ্ত) জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, যেহেতু এ মুহূর্তে তারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন সে কারণে কমিশন এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিদেশী দূতাবাসগুলোর সাথে যোগাযোগ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
ফজলুর রহমান আরও বলেন, ‘বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার সময় মঈন উদ্দিন আহমেদ সেনাপ্রধান ছিলেন। কেন অভিযানটি ব্যর্থ হয়েছিল এবং এত মানুষ ও সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছিল তা জানতে আমাদের তাকে এবং এ বিষয়ে তার বক্তব্য প্রয়োজন’।
তবে কমিশন এই দুই ব্যক্তির সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সকল চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অবগত আছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, কমিশন সরকারকে ‘কিছু লোকের’ বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে অনুরোধ জানিয়েছে, কারণ কমিশনের তাদের সাথে কথা বলার প্রয়োজন হতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত দুটি তদন্ত প্রতিবেদন কমিশন আমলে নেবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ইতোমধ্যে দুটি কমিটি যেসব প্রতিবেদন তৈরি করেছে সেসব পেয়েছেন।
উল্লিখিত কমিটি দুটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী(অব.) এবং সাবেক সচিব আনিসুজ্জামান।
কমিশন সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া তৎকালীন বিডিআর কর্মীদের সাথে কথা বলবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে রহমান বলেন, কমিশন সাবেক বিডিআর সৈন্যদের সাথে যোগাযোগ করবে না।
তবে তিনি বলেন, সাবেক বিডিআর সৈন্যরা তথ্য দিতে চাইলে কমিশনের সাথে সরাসরি বা এই https://www.bdr-commission.org ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন।
বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ