সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে দুই দশকে মরে গেছে ২৬টি নদী! সঙ্গে মরেছে তিন শতাধিক ছোট-বড় খাল। এসব নদীতে এখন আর লঞ্চ, স্টিমার ও কার্গো ভ্যাসেল চলাচল করতে পারে না। এতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৌবন্দর মোংলার সঙ্গে সারা দেশের কার্গো ভ্যাসেলসহ নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষকরা চাষাবাদ করতে শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না। বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছরই ফসল পানিতে ডুবে নষ্ট হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। হ্রাস পাচ্ছে জমির উর্বরতা শক্তি। বিনষ্ট হচ্ছে সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি। এসব নদনদীর অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে ভাটার সময় হাঁটুপানিও থাকে না। পলি জমে মরে যাওয়া এই ২৬ নদনদী হচ্ছে পুটিমারী, বিশনা, দাউদখালী, মোংলা, ভোলা, বিষখালী, হুজি, জৌখালী, কালীগঙ্গা, খোন্তাকাটা, রায়েন্দা, বলেশ্বর, ভৈরব, তালেশ্বর, ভাষা, বেমরতা-দোয়ানিয়া, কুচিবগা, ছবেকী, রাওতি, বেতিবুনিয়া, কলমী, দোয়ানিয়া, যুগীখালী, কুমারখালী ও চিত্রা। দুই দশক ধরে অতিরিক্ত পলি জমে এসব নদী ভরাট হয়েছে। এ ছাড়া মরে গেছে জেলার তিন শতাধিক ছোটবড় খাল। এখন স্বাভাবিক অবস্থায় প্রবহমান রয়েছে জেলার মাত্র তিনটি নদনদী। এগুলো হলো- দড়াটানা, পানগুছি ও পশুর নদ। বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা মৎস্য বিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভেড়িবাঁধ দিয়ে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের ফলে ফসলি জমিতে স্বাভাবিক জোয়ারের পানি না উঠতে পারছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫টি পোল্ডারের ১৬৫টি স্লুইস গেটে সরকারিভাবে কোনো লোকবল নিয়োগ না থাকায় ভাটার পানি নামার সময় ফ্লাপগেটগুলো (স্লুইস গেটের নিচের অংশ) সব সময় বন্ধ থাকে। ফলে ভরাট হয়েছে নদী। অন্যদিকে ফারাক্কা বাঁধের কারণে এসব নদীতে উজানের পানি না আসায় দীর্ঘ সময় ধরে জোয়ারের পানি স্থির হয়ে থাকে। এতে অতিরিক্ত পলি জমেও ভরাট হয়ে গেছে নদী-খাল। এ কারণে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি ভাটায় দ্রুত নামতে না পেরে ফসলি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। হ্রাস পাচ্ছে জমির উর্বরতা শক্তি। মরে যাচ্ছে বাগেরহাটের সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম রাসেল বলেন, জেলার ২৬টি নদনদী ও খাল ভরাট হওয়ায় দেশীয় স্বাদুপানির মাছ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। সমুন্দ্রের লোনাপানি আটকে থাকায় স্বাদুপানির দেশি শরপুঁটি, পাবদা, শিং, মাগুর, ফোলই, খৈলশা, গজাল, চুচড়া, চান্দা, রয়ভেদাসহ প্রায় অর্ধশত প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ দ্যা সুন্দরবনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ভাটার সময় ফ্লাপগেটগুলো সব সময় বন্ধ থাকে। ভাটার স্রোত না থাকায় ২৬টি নদনদী ভরাট হয়েছে। এসব নদী দ্রুত ড্রেজিং ও ফ্লাপগেটগুলো খোলা রাখার দাবি জানান তিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান আল বেরুনী জানান, জেলায় এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে প্রবহমান দড়াটানা, পানগুছি ও পশুর নদ। মোংলা বন্দর থেকে ঘষিয়াখালী চ্যানেল হয়ে বন্দরের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের রুটটি সচল রাখতে রামপাল উপজেলা সদর হয়ে দাউদখালী নদীতে ড্রেজিং করা হয়েছে। ভরাট হতে থাকা এসব নদী খননে পানি উন্নয়ন বোর্ড সচেষ্ট রয়েছে।