২৩ বছর আগে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয় পলিথিন শপিং ব্যাগ। বর্তমান সরকার ফের নিষিদ্ধ করলেও থামানো যাচ্ছে না পলিথিনের আগ্রাসন।
পলিথিন উৎপাদন, বিপণন ও মজুতের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় গত বছরের নভেম্বর থেকে অভিযান শুরু করে। কিন্তু বিন্দুমাত্র কমেনি এর ব্যবহার। উল্টো হঠাৎ করেই অভিযানে ভাটা পড়েছে। এখনো কাঁচাবাজার, মাছবাজার, মাংসের দোকান, মুদি দোকান- সর্বত্র পলিথিন ব্যাগেই দেওয়া হচ্ছে পণ্য। পাঁচটি পণ্য কিনলে বিনা পয়সায় মিলছে পাঁচ-সাতটি পলিথিন ব্যাগ। মাছ-মাংস কিনলে নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হচ্ছে একাধিক পলিথিন। নিষিদ্ধ পণ্যটির পাইকারি দোকান বা উৎপাদনকারী কারখানাগুলোও আগের মতোই চলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) হিসাবে দেশে প্রতিদিন ৩ হাজার কারখানায় ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন হচ্ছে। গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ লাখ ৬০ হাজার টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৯২ হাজার ১০৪ টনই বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর মিনিপ্যাক। সংস্থাটির হিসাবে দেশে বছরে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক উৎপন্ন হয় প্রায় ৮৭ হাজার টন। মাসে উৎপন্ন হয় ৭ হাজার টনের বেশি। সেখানে গত ৩ নভেম্বর অভিযান শুরুর পর ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে ৩০৭টি অভিযানে ১১৭ টনের কিছু বেশি পলিথিন ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে ১১টি পলিথিন উৎপাদনকারী কারখানা। যদিও এই সময়ে ৬০১টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এতে সরকারের আয় বাড়লেও পলিথিন আগ্রাসন কমেনি। এর মধ্যে কয়েকটি স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী টিমের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই জব্দ করা মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে যায় পলিথিন কারখানার মালিক-শ্রমিকরা। পলিথিনবিরোধী অভিযানও হঠাৎ থমকে গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও অতিরিক্ত সচিব তপন কুমার বিশ্বাস গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অভিযান বন্ধ হয়নি। সরকারি নানা প্রোগ্রামের কারণে ব্যস্ত থাকায় কিছুদিন ধরে নিয়মিত অভিযান কমেছে। শিগগিরই আবারও জোরেশোরে অভিযান শুরু হবে।
প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতায় ধ্বংস হচ্ছে কৃষিজমি। বন্ধ হচ্ছে নদী-নালা। খাদ্যচক্রে মিশছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা ক্যান্সার, কিডনি বিকলসহ নানা প্রাণঘাতী রোগের জন্ম দিচ্ছে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির (ইউএনইপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদী দিয়ে প্রতিদিন ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে মিশছে। ২০২১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় প্রতি কেজি লবণে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬৭৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে পলিথিনের শপিং ব্যাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। ৩ নভেম্বর থেকে শুরু করেন পলিথিনবিরোধী অভিযান। গত ৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলনে তিনি সবাইকে পলিথিন বর্জনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পলিথিনের কারণে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী উদ্ধার করা যাচ্ছে না। নদীর নিচে তিন থেকে চার আস্তরের পলিথিন জমা হওয়ায় ড্রেজিং করা যাচ্ছে না।’ তবে কোনো বক্তব্য, অনুরোধ, হুঁশিয়ারি বা অভিযান বাজার থেকে পলিথিন ব্যাগ সরাতে পারেনি।