আবাসন খাতে মোট রিটেইল বিনিয়োগের ৭০-৭৫% আবাসন খাতে বিনিয়োগ করে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। যা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সময়ে সময়ে বৃদ্ধি করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ফরমান আর চৌধুরী।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : মানুষের প্রধানতম চাহিদার একটি বাসস্থান। এ বাসস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা কেমন?
ফরমান আর চৌধুরী : বাসস্থান মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম এবং এটি জীবনের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে জনসংখ্যার চাপ এবং শহুরে সম্প্রসারণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে নিজস্ব বাসস্থান থাকা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যাংকগুলো হোম ইনভেস্টমেন্ট প্রদান করে, যা মানুষের স্বপ্নের বাড়ি অর্জনকে সহজ করে তোলে। বাংলাদেশ ব্যাংকও আবাসন খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখে এবং ব্যাংকগুলোকে এ খাতে ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ প্রদানে উৎসাহিত করছে। আমরা ইতোমধ্যে রিটেইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য হোম ইনভেস্টমেন্ট ও সেমি-পাকা হোম ইনভেস্টমেন্ট অংশীদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রদান করছি। এর ফলে দেশের আবাসন সমস্যা সমাধানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : নিজের বাসস্থান তৈরিতে ব্যাংক কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে?
ফরমান আর চৌধুরী : ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি হোম বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে, যা গ্রাহকরা তাদের আয় অনুযায়ী সহজ কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারেন। সাধারণত বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদি আবাসন বিনিয়োগ প্রদান করে থাকে, যার মেয়াদ ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। তাছাড়া কিছু ব্যাংক কম আয়ের মানুষদের জন্য বিশেষ প্রোগ্রাম বা সাশ্রয়ী হাউজিং প্রকল্পেও অর্থায়ন করে থাকে। সাধারণত ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ৭০% পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রদান করে এবং অবশিষ্ট ৩০% গ্রাহককে নিজস্ব অর্থ দিয়ে প্রদান করতে হয়। আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, আমরা ইতোমধ্যে গ্রামাঞ্চলে ব্যক্তি পর্যায়ে সেমি-পাকা হোম বিনিয়োগ প্রদান করে থাকি, এর মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের সহজ শর্তে বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে আল-আরাফাহ্ ব্যাংক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়াও শহরাঞ্চলে ট্রাইপাট্রিট চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রদান করে থাকি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : চাহিদার তুলনায় ব্যাংক দেওয়ার বিনিয়োগ/ঋণের পরিমাণ কি বাড়ানো উচিত?
ফরমান আর চৌধুরী : আবাসন চাহিদার বৃদ্ধি, সক্ষমতা এবং দেশের অর্থনীতিতে এ খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন বাড়ানো উচিত। তবে এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি নির্ধারণ ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করা আবশ্যক।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাদের প্রতিষ্ঠান হোম লোন দিলে রিটার্ন হার কত?
ফরমান আর চৌধুরী : ইসলামী ব্যাংকে রিটার্ন হার বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় গ্রাহকের সম্মতিতে নির্ধারিত হয়, যেমন এইচপিএসএমভিত্তিক চুক্তিতে মুনাফার হার ১২.৫% থেকে ১৪% হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ব্যাংকগুলোতে হোম লোন নিতে হলে অনেক বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় গ্রাহকদের অভিযোগ কতটুকু সঠিক?
ফরমান আর চৌধুরী : ব্যাংকগুলোতে কিছু ক্ষেত্রে ঝামেলা হতে পারে, যেমন জমির ডকুমেন্টেশনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বিনিয়োগ আবেদন থেকে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে বেশ কয়েকটি ধাপ থাকে, যেমন কাগজপত্র যাচাই-বাছাই, সম্পত্তি মূল্যায়ন, গ্রাহকের কিস্তি প্রদানের সক্ষমতা যাচাই ইত্যাদি। আমাদের ব্যাংকে ঝামেলা কমানোর জন্য সহজ এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়। আমরা অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ফিন্যান্সিয়াল এপ্রুভাল ৩ কর্মদিবসের মধ্যে দিয়ে থাকি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দেশের অর্থনীতির অন্যতম খাত আবাসন। ব্যক্তি আবাসন ঋণের প্রতি ব্যাংকগুলোর বেশি আগ্রহ নাকি যৌথ আবাসনে আগ্রহ বেশি।
ফরমান আর চৌধুরী : বর্তমানে ব্যাংকগুলোর প্রধান আগ্রহ রিটেইল ব্যাংকিং বিনিয়োগের দিকে বেশি। যদিও যৌথ আবাসন খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে, তবে ব্যক্তিগত আবাসন বিনিয়োগ এখনো ব্যাংকগুলোর প্রধান লক্ষ্য। যেহেতু ব্যক্তি আবাসন বিনিয়োগের ঝুঁকি কম এবং বিনিয়োগ গ্রহীতার ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাই এটি ব্যাংকগুলোর জন্য একটি লাভজনক খাত। ব্যক্তিপর্যায় আবাসন বিনিয়োগ চাহিদা বেশি থাকায় ব্যাংকগুলো সাধারণত এ খাতে বেশি আগ্রহী।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাদের ব্যাংক আবাসন খাতে মোট ঋণের কত ভাগ লোন দেয়?
ফরমান আর চৌধুরী : বর্তমানে গ্রাহকদের আগ্রহ শরীয়াহ্ভিত্তিক রিটেইল বিনিয়োগের প্রতি দিন দিন বাড়ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে রিটেইল বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং আবাসন বিনিয়োগ জোরদার করা। আমাদের ব্যাংক আবাসন খাতে মোট রিটেইল বিনিয়োগের ৭০-৭৫% বিনিয়োগ করে থাকে, যা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সময়ে সময়ে বৃদ্ধি করা হয়।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে আপনাদের ব্যাংক কীভাবে সহায়তা করে?
ফরমান আর চৌধুরী : বর্তমানে গ্রাহকদের আবাসন চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পরিবারের যাতায়াত সুবিধার জন্য গাড়ি কেনার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে আমরা নতুন ও সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনার জন্য সহজ শর্তে অটো বিনিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকিং সহায়তা করে থাকি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : নতুন গাড়ি ছাড়া ব্যাংক ঋণ দিতে চায় না। বাজার বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোর সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি ক্রয়ে ঋণ দেওয়া কি সম্ভব?
ফরমান আর চৌধুরী : সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনার জন্য বিনিয়োগ দেওয়া সম্ভব, তবে এর জন্য ব্যাংকগুলোকে গাড়ির অবস্থা এবং বাজারমূল্যের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। আমাদের ব্যাংক ইতোমধ্যে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ প্রদান করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আবাসন এবং গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ঋণের ওপর সুদের হার অনেক বেশি। এটা কতটুকু সঠিক?
ফরমান আর চৌধুরী : আবাসন এবং গাড়ি বিনিয়োগের মুনাফার হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে। কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী মুনাফার হার সময়ে সময়ে নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আবাসন এবং গাড়ি ঋণের ক্ষেত্রে আপনাদের নতুন কোন পরিকল্পনা আছে কিনা?
ফরমান আর চৌধুরী : আমরা ইতোমধ্যে গাড়ি বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি যেমনঃ সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির জন্য বিনিয়োগ। এছাড়াও, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক অটোমোবাইল সেক্টরকে আরও উৎসাহ করার জন্য গাড়ির ক্রয় মূল্যের বিনিয়োগের হার ৪০% থেকে ৬০% ও হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে ৭০% এবং বিনিয়ো সীমা ৪০ লক্ষ থেকে ৬০ লক্ষ টাকায় বৃদ্ধি করেছে এবং সে অনুযায়ী আমাদের অটো বিনিয়োগ চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : মানুষের এই মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যাংকগুলোর ভূমিকা আরো সহজ করা সম্ভব কিনা? ফরমান আর চৌধুরী : আমরা গ্রাহকদের জন্য দ্রুত বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকরণ, ডিজিটাল আবেদনর ব্যবস্থা, এবং সহজ শর্তাবলীর সুবিধা দিতে কাজ করছি। এছাড়াও গ্রামীণ এলাকায় হাউজিং বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।