বাবার দূর সম্পর্কের সেই চাচার নাম ছিল শফিউদ্দিন। আমরা ডাকতাম ‘শফিদাদু’। পরে শফি বাদ দিয়ে শুধু ‘দাদু’। বিয়েশাদি করেননি। নানা রকমের ব্যবসার চেষ্টায় দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত চষে বেড়াতেন। কোনো ব্যবসাতেই সুবিধা করতে পারেননি। শুরু করতেন বিশাল আগ্রহ নিয়ে। দুচার মাসের মধ্যে লালবাতি জ্বলে যেত ব্যবসায়। দাদু মন খারাপ করে অন্যত্র চলে যেতেন নতুন ব্যবসার আশায়। এ কারণে বিস্তর লোকের সঙ্গে তাঁর চেনা-পরিচয় ছিল। অভিজ্ঞতা ছিল নানা ধরনের। এক ব্যবসা ছেড়ে আরেক ব্যবসা ধরার ফাঁকে আমাদের বাড়িতে আসতেন। সদা হাসিমুখের মানুষ। খেতে বসে বাবা হয়তো জানতে চাইলেন ‘কোন ব্যবসা ছেড়ে এলে, শফিচাচা?’
দাদু হয়তো তখন ভাতের গ্রাস মাত্র মুখে তুলেছেন, কোনো রকমে বললেন, “মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে ভাতের হোটেল করেছিলাম। রাঁধুনিটা এত বাজে ছিল, তার রান্না করা তরকারি তো মুখে দেওয়া যেতই না, ভাতটা পর্যন্ত হয় চাউলের মতোই শক্ত আর নয়তো আটার দলার মতো থকথকে। খেতে এসে লোকে পয়সা তো দেয়ই না, উলটো গালাগাল করে যায়। দুচার বার মার খাওয়ারও উপক্রম হয়েছে। কী আর করা, হোটেল বন্ধ করে দিলাম।”
মা জানতে চাইলেন, ‘এরপর কোন ব্যবসা ধরবেন?’
নলা মাছের মাথায় কামড় দিয়ে দাদু বললেন, ‘এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। দু-চার দিন এই বাড়িতে থেকে পরবর্তী ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেব।’
দাদু দু-চার দিন থাকবেন শুনে আমরা ছোটরা বেজায় খুশি। কারণ দাদুর থাকা মানেই হচ্ছে গল্প আর গল্প। সেগুলোকে অবশ্য গল্প না বলাই ভালো। সবই তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা। সত্য-মিথ্যা তিনিই জানেন। বাড়ির বড়দের চেয়ে ছোটদের সঙ্গে গল্প করতেই তিনি বেশি ভালোবাসেন। আমরাও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি তাঁর গল্পকাহিনি বা অভিজ্ঞতা যেটাই বলি না কেন। সে দিন খাওয়া-দাওয়ার পরই তাঁকে আমরা ঘিরে ধরলাম। ‘তোমার ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা বলো, দাদু।’
তিনি বসেছিলেন কাচারি ঘরের বারান্দায়। বারান্দার মাটিতে পাটি বিছিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে চা খাচ্ছেন। খাওয়া-দাওয়ার পর এক কাপ চা খেতে তিনি খুবই ভালোবাসেন। আমরা বসেছি তাঁকে ঘিরে। ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা শুনে নড়েচড়ে বসলেন। চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আ রে ভূতের গল্প তো শুনতে হয় রাতেরবেলায়। দিনদুপুরে কি ভূতের গল্প জমে?’
আমরা একসঙ্গে বললাম, ‘না না দিনেরবেলায়ই শুনব। রাতে শুনলে ভয়ে ঘুমাতে পারব না।’
দাদু তারপর শুরু করেছিলেন। তিনি কথা বলেন খুবই সুন্দর ভঙ্গিতে। একেবারে বইয়ের ভাষায়। আজও সেভাবেই শুরু করলেন।
“বহু বছর আগের কথা। আমার তখন সতেরো আঠারো বছর বয়স। ব্যবসার পোকা মাত্র মাথায় ঢুকেছে। বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে চলে গেছি গাইবান্ধায়। সেখানকার পলাশপুর গ্রামে আমার বন্ধু থাকে। বাজারে তার পিঁয়াজ-রসুনের আড়ত। তার সঙ্গেই ব্যবসা করব। যেতে হয় বড় একটা নদী পার হয়ে। নদীর নাম মানস। তখনকার দিনে রাস্তাঘাট এত উন্নত ছিল না। ভাঙাচোরা বাস চলে। রাস্তাও খুব খারাপ। বর্ষাকাল। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই। থামার নাম নেই। তাও আমি রওনা দিয়েছি। বাস যেখানে থামবে অর্থাৎ বাসের শেষ গন্তব্য, সেখানে পৌঁছাবার কথা দুপুরের পর পর। অর্ধেক রাস্তায় গিয়েই বাসটা গেল নষ্ট হয়ে। কখন ঠিক হবে ড্রাইভার বলতে পারে না। তারা চেষ্টা করছে। বৃষ্টি আগের মতোই চলছে। বিকেলবেলাই অন্ধকার হয়ে গেছে চারদিক। এদিকে আমার কোনো চেনাজানা লোক নেই। বাসটা নষ্ট হয়েছে খুবই নির্জন একটা এলাকায়। কাছাকাছি কোনো গ্রামও নেই। তখনকার দিনে মাইলের হিসাব। এখান থেকে মাইল পাঁচেক হেঁটে গেলে নদী। সেই নদী পেরিয়ে ওপারে নেমে আরও মাইলখানেক হেঁটে গেলে পলাশপুর বাজার। বাজারের পাশেই সেই বন্ধুর বাড়ি।’
‘কী করব বুঝতে পারছি না। আমি তখনো এ রকম রোগাপটকাই ছিলাম। তবে সাহস ছিল দুর্দান্ত। ভয় বলতে কিছু ছিলই না। হাঁটা দিলাম। নদীতীরে পৌঁছাতে পারলে পারাপারের নৌকা পাবই। ওপারে পৌঁছাতে পারলে আর চিন্তা কী? পলাশপুর বাজার পর্যন্ত যেতে পারলেই তো হয়ে গেল।’
‘আমি হাঁটি খুব দ্রুত। অন্য মানুষ ধীরে ধীরে দৌড়ালে যেমন হয়, আমার হাঁটা তেমন। বৃষ্টিতে অন্ধকারে সেভাবে হাঁটতে লাগলাম। পিঠে রেক্সিনের ব্যাগ। রাস্তা চিনি না। বাস ড্রাইভার বলে দিয়েছে এই রাস্তায়ই শেষ হয়েছে নদীতীরে গিয়ে। বৃষ্টিতে অন্ধকারে আমি ঝড়ের বেগে হাঁটতে লাগলাম। বেশ কিছু গ্রাম আর বনবাদাড়ের ভিতর দিয়ে নদীর ঘাটে এসে পৌঁছালাম। রাত তেমন হয়নি। হয়তো ন’টা সাড়ে ন’টা বেজেছে। নিঝুম নির্জন চারদিক। কোথাও কোনো মানুষজন নেই। বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই আলোয় ঘাটে শুধু একটা নৌকা বাঁধা দেখছি। কিন্তু মাঝি নেই!’
“এখন কী হবে? কেমন করে নদী পার হব? ওপারে গিয়ে না পৌঁছালে কোথায় রাত কাটাব? আশপাশে কোনো গ্রাম বাড়িঘর বাজারঘাট কিছুই নেই। খেয়াঘাটে কয়েকটা দোকান আছে। সবই বন্ধ। একবিন্দু আলো নেই কোথাও। কী করি? নদীতীরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এমন অসহায় লাগছিল, কী বলব?”
এ সময় কে একজন আমার কাঁধে হাত দিল। ‘‘ওপারে যাবেন না কি সাহেব? চলুন পার করে দেই। আমি এই ঘাটের শেষ নৌকার মাঝি। ঘাটে যে নৌকাখানা বাঁধা দেখছেন, ওটা আমারই। আমার নাম পবন। পবনমাঝি। চলুন, চুলন।”
‘‘আমার ধড়ে প্রাণ ফিরে এলো। অন্ধকারে মাঝির চেহারা দেখা যাচ্ছে না। সে কোথায় ছিল বা কোথা থেকে এলো কিছুই বুঝতে পারলাম না। অতকিছু বোঝার সময়ও ছিল না। নৌকায় চড়লাম। ছই ছাড়া ডিঙি নৌকা। পবনমাঝি দ্রুত নৌকা বাইতে লাগল। বৃষ্টি আর অন্ধকার আগের মতোই। তবে নদী শান্ত। আমরা দুজন ভিজে একাকার হচ্ছি। আমি একবারও মাঝির দিকে তাকাইনি। ওপারের অন্ধকারের দিকে মুখ করে বসে আছি। নৌকা তরতর করে এগোচ্ছে।”
ওপারে পৌঁছাতে আধাঘণ্টার মতো লাগল। পাড়ে নেমে পবনমাঝিকে বললাম, “কত দিতে হবে ভাই তোমাকে?”
পবন উদাস গলায় বলল, “আমার টাকা-পয়সা লাগে না। ওসব দিয়ে আমি কী করব? আপনাকে পার করে দিতে পেরেছি, তাতেই আমি খুশি।”
শুনে আমি হতভম্ব। “বলো কি ভাই? তোমার কি খাওয়া পরার দরকার হয় না? ঘর-সংসার ছেলেপুলে নেই? টাকা-পয়সা না হলে খাবে কী? সংসার চলবে কেমন করে?”
পবনমাঝি বলল, “আমার ওসব দরকার হয় না সাহেব। ঘর সংসার ছেলেপুলে সবই একসময় ছিল। এখন আর তাদের খোঁজখবর রাখি না। বাড়ি যাব বলে আমিও এক রাতে এভাবে নদী পার হতে এসেছিলাম। সে রাতেও এরকম বৃষ্টি আর অন্ধকার ছিল। চারজন লোক ছিল নৌকায়। আমার সঙ্গে কিছু টাকা-পয়সা ছিল। সব তারা ছিনিয়ে নিল। তাতেও তাদের মন ভরল না। আমার গলাটাও কেটে ফেলল। লাশ ফেলে দিল মাঝনদীতে। তারপর থেকে আমি এই ঘাটেই থাকি। এরকম বৃষ্টি বাদলার রাতে আপনার মতো বিপদে পড়া লোককে পার করে দিই। এই দেখুন আমার মাথাটা নেই।”
“পবনের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোয় আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম লোকটা নৌকার এক গলুইয়ে বইঠা হাতে বসে আছে। তবে তার মাথাটা নেই। শুধু ধড়টা আছে।”
গল্প শেষ করে শফিদাদু হাসলেন। “এরকম ভৌতিক অভিজ্ঞতা আমার বিস্তর। এবার যে ক’দিন এই বাড়িতে থাকব রোজই সেসব গল্প তোদের শোনাব। তবে একটা শর্ত আছে, গল্প শুরুর আগে এককাপ চা খাওয়াতে হবে, শেষ হলেও এককাপ চা খাওয়াতে হবে। যা এখন ফার্স্ট ক্লাস এক কাপ চা নিয়ে আয়।”