চারদিকে খাঁখাঁ! কেউ বলছেন পরিস্থিতি নাকি ধু-ধু মরুভূমির মতো। কেউ আবার বলছেন কভিডকালেও এমন চিত্র দেখা যায়নি। তবে যে যাই বলুক না কেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বৃহত্তম স্থলবন্দর পেট্রাপোলের চেহারা যে মোটেই ভালো না, তা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন। তারা জানান, গত বছরের ঈদেও যেখানে পেট্রাপোল স্থলবন্দর এলাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসায়ে যুক্ত মানুষজন দম ফেলার ফুরসত পাননি। আর এবার মাছি মারতে হচ্ছে তাদের। গতকাল পেট্রাপোল স্থলবন্দর ঘুরে দেখা গেল এক হতাশা ও অলসতার ছবি। ভ্যানওয়ালা থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যবসায়ী প্রত্যেকেই লক্ষ্মী লাভের আশায় দিন গুনছেন।
এ বিষয়ে দেশ ট্রাভেলসের কলকাতা চ্যাপ্টারের মালিক মুহাম্মদ আলি হোসেন শেখ জানান, বরাবর ঈদে আমরা যে ব্যবসা করে থাকি, সেই তুলনায় এবারের ঈদে ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। এর পেছনে রয়েছে ভিসা ব্যবস্থা। ভারত সরকার বাংলাদেশিদের জন্য ৬০ শতাংশ ট্যুরিস্ট ভিসা, ৩০ শতাংশ মেডিকেল ভিসা এবং বাকি অন্য ভিসা প্রদান করে থাকে। কিন্তু এবারে ভিসা ইস্যু হয়নি বলে কোনোরকম ব্যবসা পাইনি।
তিনি জানান, পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক ছিল তখন প্রতিদিন দেশ ট্রাভেলসের আটটি বাস চলাচল করত কলকাতার নিউমার্কেট থেকে পেট্রাপোল পর্যন্ত। আর এখন পর্যটকের অভাবে ওই একই যাত্রাপথে মাত্র একটি বাস চলাচল করে, তাও আবার মাসে ১৫ দিন। তার দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রাপোল চেকপোস্ট কিংবা কলকাতার নিউমার্কেটে মাত্র ২ শতাংশ ব্যবসা চলছে, বাকি ৯৮ শতাংশই বন্ধ। তিনি আরও জানান, যাত্রীসংখ্যা কম, তেল খরচের অর্থও উঠছে না। তাই শ্যামলী এসপি, সোহাগ, এনআর, সৌদিয়া, গ্রীন লাইন, রয়েল কোচসহ প্রতিটি পরিবহন সংস্থায় তাদের বাস পরিসেবা বন্ধ রেখেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে কেন্দ্রের মালিক বাবলু রায় জানান, আগে যে পরিস্থিতিতে কাজ করতাম, সেটাই ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আগে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ জন পর্যটক আসতেন। কিন্তু বর্তমান দুই-তিন মাস মিলিয়েও সেই গ্রাহক পাই না। এমনকি ঈদের সময় যে পরিমাণ পর্যটক আসতেন, আনন্দ উপভোগ করতেন, এবার সেই পর্যটক নেই। আর তার প্রভাব আমাদের ব্যবসায় পড়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে মেডিকেল এবং তীর্থ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশি পর্যটকরা কলকাতা ও ভারতে আসছেন। তবে সেই সংখ্যাটা খুবই কম। তার অভিমত, ট্যুরিস্ট ভিসা যত দিন না চালু হবে তত দিন স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে না। বর্তমান পরিস্থিতিকে লকডাউনের সঙ্গে তুলনা টেনে গ্রীন লাইন পরিবহনের কর্মী সুব্রত ঘোষ জানান, লকডাউনের সময় বুঝতাম সেটা বন্ধ, কিন্তু এখন না খোলা, না বন্ধ। সাধারণ মানুষ পুরোপুরি শুয়ে পড়েছে। আগে প্রতিদিন প্রতিটি পরিবহনের তরফে চারটি করে বাস আসা-যাওয়া করত। এখন সব পরিবহন একত্রিত হয়ে একটি করে বাস ছাড়া হয়। পেট্রাপোল সীমান্তে ‘কস্তুরী’ নামক ভাতের হোটেলের কর্মী প্রসেনজিৎ পাল জানান, আমাদের হোটেলটি মূলত বাংলাদেশি পর্যটকের ওপরে নির্ভরশীল। আগে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত হাঁড়ি ভাত হতো, আর এখন মাত্র দুই হাঁড়ি ভাত বসানো হয়। আগে আয় হতো ১২ হাজার রুপির ওপর, আর এখন সেই আয় নেমে এসেছে ২ হাজারের কম। মূলত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করেই চলছে এই হোটেল। এমনকি বাংলাদেশি পর্যটকদের ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে চাকা ঘোরে পেট্রাপোল সীমান্তে এক স্থানীয় লটারির টিকিট বিক্রেতারও। চন্দন দত্ত নামে ওই লটারির টিকিট বিক্রেতা জানান, আমার এখানে যেমন স্থানীয় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা টিকিট কিনতেন, ঠিক সেভাবে বাংলাদেশি পর্যটকরাও টিকিট কিনতেন। অনেক বাংলাদেশি লটারিতে নগদ অর্থও জিতে ছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র স্থানীয়দের ওপরেই আমাকে নির্ভর করতে হয়। আগে যেখানে দৈনিক ১ হাজার রুপি আয় হতো, এখন ১০০ রুপিও হয় না। জানা যায়, মাস কয়েক আগেও তথাকথিত এই ‘ব্যাড প্যাচ’ বা ব্যবসায়িক মন্দা ছিল না। শুরুটা হয়েছে গত ৫ আগস্ট ছাত্র অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের মধ্য দিয়ে। ঘটনার আট মাস কেটে গেলেও ক্ষত শুকায়নি। নিরাপত্তা ও কর্মীসংকটের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশিদের জন্য সাধারণ ভিসা বন্ধ রেখেছে ভারত সরকার। আবার মেডিকেল ভিসা চালু থাকলেও তা প্রদানের সংখ্যা খুবই কম। আর তার প্রভাব গিয়ে পড়েছে ব্যবসায়। পর্যটকের অভাবে যেমন কলকাতার নিউমার্কেটে প্রভাব পড়েছে, অনেক ব্যবসায়ী যেমন তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন বা অন্য ব্যবসায় ঝুঁকছেন ঠিক তেমনি অবস্থা পেট্রাপোল স্থলবন্দরেও। কিন্তু সবার মনেই একটি প্রশ্ন, কবে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে? সবাই বলছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উভয়কেই নমনীয় হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হতে হবে। অনেকে আবার ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দুই রাষ্ট্রনেতার সম্ভাব্য বৈঠকের দিকেও তাকিয়ে রয়েছেন।