উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী কৃষিনির্ভর বরেন্দ্র জেলা নওগাঁ। এ জেলায় রয়েছে প্রায় ৪৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি মসজিদ। তার নাম ‘কুসুম্বা মসজিদ’। স্থাপত্যশৈলী ও নন্দনতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে দেশের ৫ টাকার নোটে কুসুম্বা মসজিদের ছবি ছাপানো হয়েছে; যা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। কুসুম্বা মসজিদের মুয়াজ্জিন মাওলানা ইসরাফিল আলম বলেন, প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসে কুসুম্বা মসজিদ ঘুরে দেখতে। মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা ওবায়দুল হক বলেন, সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ৯১০ হিজরিতে এবং সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহ ৯৬৬ হিজরিতে এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ ৫৬ বছর লেগেছে নির্মাণকাজ শেষ করতে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল বলেন, প্রাচীন এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন দর্শনার্থীরা আসেন দেশবিদেশ থেকে। ইতোমধ্যেই রেস্ট হাউস ও পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বৃদ্ধি করার জন্য অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। কুসুম্বা মসজিদ সবরখান বা সোলায়মান নামে ধর্মান্তরিত এক মুসলমান নির্মাণ করেন। মূল প্রবেশপথে শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয়, এই মসজিদটি ৯৬৬ হিজরি বা ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি। শেরশাহের বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দীন বাহাদুরের শাসনামলে (১৫৫৪-১৫৬০ সালে) নির্মিত। সে হিসাবে মসজিদটির বর্তমান বয়স ৪৫৮ বছর। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে তার মন্ত্রী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা রামন দল ৯০৪ হিজরি বা ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বাংলাদেশে সুলতানি আমলের যত নিদর্শন আছে, তার মধ্যে একটি নওগাঁর কুসুম্বা মসজিদ। প্রায় ৪৫০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি। নওগাঁ জেলা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে মান্দা উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত কুসুম্বা মসজিদ।
রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের মান্দা ব্রিজের পশ্চিম দিকে ৪০০ মিটার উত্তরে কুসুম্বা মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণ দিকে রয়েছে প্রায় ১০০ বিঘার বিশাল দিঘি। এটি লম্বায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট ও চওড়ায় প্রায় ৯০০ ফুট। গ্রামবাসী এবং মুসল্লিদের খাবার পানি, গোসল ও অজুর প্রয়োজন মেটানোর জন্য এই দিঘিটি খনন করা হয়েছিল। কুসুম্বা মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৫৮ ফুট লম্বা, ৪২ ফুট চওড়া। চারদিকের দেয়াল ৬ ফুট পুরু। তার ওপর বাইরের অংশ পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের সামনের অংশে রয়েছে তিনটি দরজা। দরজাগুলো খিলানযুক্ত মেহরাব আকৃতির। মসজিদের চার কোনায় রয়েছে চারটি মিনার। রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে তিনটি গম্বুজ নষ্ট হয়েছিল। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কার করে। মসজিদের ভেতর দুটি পিলার রয়েছে। উত্তর দিকের মেহরাবের সামনে পাথরের পিলারের ওপর তৈরি করা হয়েছিল একটি দোতলা ঘর। এই ঘরটিকে বলা হতো জেনানা গ্যালারি বা নারীদের নামাজের ঘর। এখানে নারীরা নামাজ পড়তেন।