মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুই সদস্যের কোনো অখ্যাত ফার্মকে বাইডেন প্রশাসনের সহায়তায় রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যবহারের জন্য ইউএসএইড হিসেবে ২৯ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে। এমন কোন ফার্ম রয়েছে- যেটি তেমন পরিচিত নয় এবং যার একজন প্রধান এবং একজন সহকারী রয়েছে- তা জানার জন্য অনেকেই এখন উৎসুক। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো নাম না জানা গেলেও মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে বেশ কিছু এনজিও প্রতিষ্ঠানের নাম। যার মধ্যে আবার দু-একটি প্রতিষ্ঠানে মাত্র দুজনও রয়েছেন। অবশ্য পুরো বিষয়টি এখনো পরিষ্কার হয়নি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে যখন নানা কথা ডালপালা ছড়িয়ে চলেছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার বলেছেন, বাংলাদেশের উগ্র বাম কমিউনিস্টদের ভোটের কাজের জন্য দেওয়া হয়েছিল ওই ২৯ মিলিয়ন ডলার। তবে এ দফায়ও ট্রাম্প দলের নাম উল্লেখ করেননি। এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে গতকাল বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নয়নে ইউএসএআইডির ২৯ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল ‘উগ্র বাম কমিউনিস্টদের’। ট্রাম্প গত শনিবার ওয়াশিংটনে কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে (সিপিএসি) অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি। এর আগের দিন তিনি বাংলাদেশে ইউএসএআইডির ২৯ মিলিয়ন ডলার অনুদান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, মাত্র দুজন কর্মী থাকা একটি নাম না জানা ছোট্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে গেছে ২৯ মিলিয়ন ডলারের অনুদান। ট্রাম্প দাবি করেন, বাংলাদেশের ‘রাজনৈতিক পরিমন্ডল শক্তিশালীকরণের’ বিষয়টি ব্যবহার করা হয়েছে উগ্র বামপন্থি কমিউনিস্টদের ক্ষমতায় আনতে।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে তুমুল আলোচনা চলছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি নিয়ে ঢাকায় নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশে এনজিও সেক্টর, বিশেষ করে বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে এত অর্থ কারা পেয়েছে এবং কীভাবে ব্যবহার হয়েছে? যদিও বাংলাদেশের এনজিও ব্যুরো বলছে, নিবন্ধিত ও সক্রিয় কোনো এনজিওর কাছে এ অর্থ আসার কোনো তথ্য তারা পায়নি। এনজিওসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবিকে অস্বাভাবিক মনে করেন তারা। সে কারণে তারা মনে করেন এমন বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউএসএআইডির উচিত- কারা ওই অর্থ পেয়েছে সেটি প্রকাশ করা। এনজিও ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি আমরা এর মধ্যেই চেক করেছি। এই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশে সক্রিয় কোনো এনজিওর মাধ্যমে এসেছে- এমন কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিছু টাকা আরও কিছু প্রক্রিয়ায় পাঠায়। সেভাবে কোনো অর্থ এসেছে কি না তা আমাদের জানা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দিক থেকে এমন অভিযোগ আসার পর বাংলাদেশের এনজিও খাতের জন্য এটি নেতিবাচক হবে, বা এনজিওদের কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত এনজিও খাত নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির। এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘এটি (ট্রাম্পের দাবি) একটি অস্বাভাবিক দাবি। আমার মনে হয় ইউএসএআইডির অর্থায়ন বাতিলকে বৈধতা দিতে এখানে বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এভাবে কোনো সংস্থার অর্থ নেওয়ারই সুযোগ নেই।’ ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২৯ মিলিয়ন ডলার যদি এমন কোনো সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র দিয়ে থাকে তাহলে সেটি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব প্রতিষ্ঠান রাজনীতি, গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গত কয়েক বছর কাজ করছে- এখন তাদের অনেকের দিকেই আঙুল তুলতে শুরু করেছেন অনেকে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের এ অর্থ ‘বাংলাদেশের রেজিম চেঞ্জ বা সরকার পরিবর্তনে ব্যবহার হয়েছে কি না’ এমন প্রচারও চলছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এনডিআই ও আইআরআইর টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট মিশন। তখন তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাজ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির কাজ করে আসছিলেন তার এমজিআর কর্মসূচির মাধ্যমে। গত কয়েক বছরে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, ‘স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ ইন বাংলাদেশ (এসপিএল) কর্মসূচির সঙ্গে আমরা কখনো কাজ করিনি। কিন্তু ট্রাম্প যা বলেছেন তা আমাদের সবার জন্যই বিব্রতকর। এখন একাডেমিক, শিক্ষামূলক এবং তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সক্ষমতাবৃদ্ধি, গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ইত্যাদি নিয়ে আমরা যে কাজ করি তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা হবে দুঃখজনক।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বা ইউএসএআইডির উচিত পরিষ্কার করে বলা- কারা তাদের ফান্ড নিয়েছে। ফান্ড তো কেউ জোর করে আনেনি। যে পেয়েছে নিয়ম মেনেছে বলেই পেয়েছে। সেখান কোনো ত্রুটি থাকলে সেই দায় তো যুক্তরাষ্ট্রের। সবাইকে বিব্রত না করে এটি তাদেরই পরিষ্কার করা উচিত।’ বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের টাকা বাংলাদেশে সরাসরি কেউ পায় না, বরং তাদের অর্থ আসে সেখানকারই কোনো ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে। তারা ঢাকায় অফিস নেয়। লোকাল পার্টনার ঠিক করে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য। সে কারণে এখানকার কোনো সংস্থার ২৯ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার দাবিটাই হাস্যকর। আবার বিভিন্ন কর্মসূচিতে যে টাকা তারা দেয় তার ৫০ শতাংশই আবার আমেরিকাতেই চলে যায়। তারপরও কেউ এমন অর্থ পেয়েছে কি না, সেটি কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে দেখা উচিত।